সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমাদের রাজনীতি সিরিজ

হিজরি সনের প্রথম মাস, মহররম। পশ্চিমাদের অর্থহীন 'happy new year' বলার মত করে অনেকে দেখছি 'হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা' জানাচ্ছেন। আমরা জানতে চাই, এই আনন্দ কিসের?
যদি এই আনন্দ এটা হয় যে, এই মহররম মাসেই ইসলাম জিন্দা হয়েছে, যার ফলে আমরা আজ নিজেদেরকে মুসলিম বলতে পারছি, নাহলে এই আলোটুকুও নিভে যেত -- তবে হ্যাঁ, তা এক বিবেচনায় আনন্দের হতে পারে বটে, তবে একইসাথে তা শতগুণ বেদনার: কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পবিত্র রক্তে ইসলামকে জিন্দা করে দিয়ে গেছেন এই মহররম মাসেই।
কিন্তু মহররমের এই 'যিবহিন আজীম' তথা মহান উৎসর্গ, যার বিনিময়ে ইব্রাহীম (আ.) তাঁর পুত্রকে ছুরির নিচে নিয়েও ফিরে পেলেন, যাঁর স্মরণে আমাদের কুরবানি আর কুরবানির ঈদ --
সেই হুসাইনকে (আ.) ভুলে আর হুসাইনের জিন্দা করা ইসলামকে ভুলে যদি আপনি 'হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা' বলেন আর প্রচার করেন, তবে আফসোস!
এজিদের দরবারেরও তো 'আলেম' ছিল!
যাহোক, রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের পর 'ইসলামী সেক্যুলারিজমের' সূত্রপাত হয়। মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ সার্বিক নেতৃত্বের পদ 'মাওলা'-কে চাপা দিয়ে 'খলিফা', 'আমির' ইত্যাদি টার্ম এর উদ্ভব ঘটে। 'মাওলাইয়াত' এর ভিতরে সার্বিক ধার্মিকতা ও আধ্যাত্মিকতা তথা রুহানিয়্যাত, এবং শাসনতন্ত্র -- উভয়ই ছিল। কিন্তু নতুন আবিষ্কৃত 'খিলাফত'-এ থাকল কেবল শাসনতন্ত্রটুকু। রুহানিয়্যাত বিবর্জিত এই 'খিলাফত'-কেই আমি বলছি 'ইসলামী সেক্যুলারিজম' এর সূচনা, যার হাত ধরে মুয়াবিয়া ও এজিদ পর্যায়ক্রমে ইসলামকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তারপর সেই এজিদি ইসলাম বিশ্বব্যাপী নানান মুখোশে বিস্তার লাভ করে, যা আজ পর্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে আছে। আমাদের বেশিরভাগ মুসলমানের জন্ম তেমন ইসলামের কোলেই। এবং আমরা চারিদিকে দেখি যে, দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ইসলামী দল ও ইসলামী সংগঠন নির্বাচনসহ নানাভাবে ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কায়েম করতে ব্যর্থচেষ্টা চালাচ্ছে। এবং তাদের স্বপ্ন হলো সেই 'খিলাফত', যেটা আদতে ছিল 'ইসলামী সেক্যুলারিজম'। তাদের বেশিরভাগই হয়ত ইখলাস সহকারে সেই 'খিলাফত' ফিরে পেতে চায়। অথচ দিশাহারা তারা জানে না যে, ঐ 'খিলাফতের' অনিবার্য আউটপুটই হলো মুয়াবিয়া ও এজিদের রাজতন্ত্র।
ইসলামের সঠিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত? আলেমগণের কি প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত? অথচ যেখানে এই গণতন্ত্রের ইতিহাস মাত্র চারশো' বছরের! তার আগে মুসলমানরা কিভাবে চলেছে? এযুগে কিভাবে চলতে পারে? আর মুহাম্মদ (সা.) এর রেখে যাওয়া সিস্টেম 'মাওলাইয়াত'-ই বা আসলে কেমন?
এসব বিষয় নিয়ে এই মহররমে অল্প কিছু লিখতে চেষ্টা করব। এটা একারণে প্রয়োজন যে, মুসলমানদের টেকসই শাসনব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তা আমরা জানি না, কেননা আমাদের জন্ম আর ইসলাম শেখা তো সেই এজিদি ইসলামের নানান মুখোশের কোলে! ফলস্বরূপ নিষ্ঠা সহকারে রক্ত দিয়েও কোনোই লাভ হচ্ছে না, কেবলই মার খাচ্ছে মুসলমান। জুলুম থেকে মুক্তি মিলছে না। অথচ জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মাস হলো এই মহররম।
আধুনিক বিশ্বে জুলুমের বৃহত্তম হাতিয়ার ব্যাংক ব্যবস্থার স্বরূপ উন্মোচন করে গত মহররমে সিরিজ লিখেছিলাম: মানি মেকানিজম (sroshta.page.link/money-mechanism )।
জালিমের জুলুমের বিরুদ্ধে টেকসইভাবে দাঁড়াতে হলে নিছক আবেগ কার্যকরী নয়, বরং একইসাথে প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের।
এই মহররমে তাই ব্যস্ততার মাঝেও শাসনব্যবস্থার কিছু মৌলিক বিষয়ে লিখতে চাই। ইসলামের কিছু প্রাসঙ্গিক ইতিহাসের আলোচনাও থাকবে সাথে।
'রাজনীতি' সিরিজটি ফলো করতে এই পোস্টে একটা কমেন্ট করে রাখতে পারেন, প্রতিটা পর্ব এখানে কমেন্টে দেয়া হবে, ইনশাআল্লাহ।
________________________________



"দেহ আপনার, নিরাপত্তা দেব আমি?"
ইতিহাসের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি তাদের দেহরক্ষীদের হাতে নিহত হয়েছেন। আবার, বহু জাতি তাদেরই আর্মি ও পুলিশের হাতে নিহত হয়েছে ও হচ্ছে। কিভাবে আমরা এই অবস্থায় উপনীত হলাম? যেখানে আমরা আমাদের দেহকে নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব গুটিকয়েক ব্যক্তি (বডিগার্ড) কিংবা (সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে) আর্মির হাতে তুলে দিলাম? অতঃপর যে বুলেট আমাকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হবার কথা ছিল, তা আমাকে হত্যা করতে ব্যবহৃত হলো?
নিশ্চয়ই মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবসময় এমনটা ছিল না। আজকে আছে, তবে ভবিষ্যতেও যে থাকবে, তা বলা যায় না। এ সংক্রান্ত একটু ইতিহাস ও একটু তত্ত্ব তাই আমাদের জানা প্রয়োজন।
কেন প্রয়োজন?
কারণ, The farther you you look into the past, the farther you will be able to look into the future -- অর্থাৎ, "আপনি যতটা অতীত (বিচক্ষণতার সহিত) দেখবেন, ঠিক ততটাই ভবিষ্যত দেখতে পাবেন।"
এজন্যে আমাদের অল্পকিছু তত্ত্ব ও অল্পকিছু ইতিহাস জানা প্রয়োজন। কারণ, যে জনগণকে রক্ষা করার কথা ছিল আর্মির, তারা উল্টা সে জাতিকেই হত্যা করেছিল ১৯৭১ সালে। সেজন্যে 'পাক-আর্মির' হাত থেকে মুক্ত হয়ে আমরা বাংলাদেশ গঠন করলাম। কিন্তু সে চিত্র বদলেছে কি?
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস আপনারা জানেন যে, এদেশের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে যুগযুগ ধরে গুম-খুন হয়েছেন ও হচ্ছেন বাংলাদেশীরাই। প্রকাশ্য রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে জনগণের রক্তে: তার টাকায় কেনা বুলেট তাকে বিদ্ধ করেছে।
এই বাংলাদেশ ভেঙে আর নতুন কোন 'দেশ' গড়বেন আপনি? সেখানেও তো চলবে সেই একই খেলা!
কেননা অস্ত্রের নিজস্ব কোনো বুদ্ধি নেই। তাকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়, সে সেভাবেই ব্যবহৃত হয়।
চারিদিকে চোখ মেলে তাকান। বিশ্বব্যাপী যত আর্মি আছে, তাদের কয়টি আর্মি বহিঃশত্রুর সাথে যুদ্ধ করছে? আর কয়টি আর্মি তাদের নিজদেশের জনগণের উপরেই চড়াও হয়েছে? দুঃখজনক বাস্তবতা এটাই যে, বিশ্বব্যাপী সশস্ত্র বাহিনীগুলো আজকে যুদ্ধ করার জন্য নয়, বরং নিজদেশের জনগণকে জুলুমতান্ত্রিক শাসনের করায়ত্বে বন্দী রাখার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। আমার পয়সায় পালা আর্মি ট্যাঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে আমার ছাত্রদের সামনে, বাচ্চাদের সামনে, বৃদ্ধদের সামনে।
এজন্যে আমাদের চিন্তা করা প্রয়োজন। না, পাক-আর্মি কত খারাপ ছিল, সেই ইতিহাস বহু পড়েছেন। এককালে হয়ত বাংলাদেশ আর্মির ইতিহাসও এভাবে কেউ না কেউ স্কুলে পড়বে। তারপর আরো নতুন কোনো আর্মির ইতিহাস। হাজারো ইতিহাস পড়লেও কোনো লাভ নেই, যদি 'চিন্তা' করার সক্ষমতা অর্জন না করেন।
অতএব, চিন্তা করুন। দেহ আপনার, নিরাপত্তা দেবেন আপনি -- এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। সৃষ্টির সকল প্রাণী তার নিজদেহের নিরাপত্তা-বিধান নিজেই করে থাকে। বাঘেরা তাদের নখ আর দাঁতগুলো খুলে উর্দিপরা বাঘদের কাছে জমা দিয়ে আসে না। বাঘের বাচ্চারা ছোটবেলায় আক্রমণ ও আত্মরক্ষা না শিখে বসে বসে টিভি দেখে না বা ফেসবুক চালায় না যে: এগুলো বাঘার্মির (বাঘ-আর্মির) কাজ।
দেহ আপনার, নিরাপত্তা বিধান করবেন আপনিই। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। ইতিহাসে বহু জাতি প্রত্যেকে নিজেরা সশস্ত্র থাকত ও যুদ্ধ করা শিখতো তরুণ বয়সেই। ইসলাম অবশ্য সন্তানকে ঘোড়ায় চড়া, অস্ত্র-চালনা ও তীর-ধনুক বিদ্যা রপ্ত করতে উৎসাহিত করে, আমরা কিতাবে পড়েছি। এযুগের ক্ষেত্রে সেটা হয়ত "গাড়ি/ ট্যাঙ্ক ইত্যাদি চালানো শেখা, AK-47 ও স্নাইপার চালানো শেখা আর গাইডেড বম্ব, মিসাইল ও ড্রোন তৈরী ও অপারেট করতে শেখা" হওয়ার কথা ছিল।
সেযুগের আরবরা যত অসভ্যই হোক না কেন, প্রত্যেকে সশস্ত্র থাকত, তলোয়ার চালানো শিখত। যার যার নিরাপত্তা তার তার। সেখানে রাসুল (সা.) ইসলাম এনে দিলেন, তারপর সেই তলোয়ারগুলোই ন্যায়ের পথে পরিচালিত হলো।
পক্ষান্তরে, আমরা যদি আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধুমাত্র আর্মির হাতে দিয়ে রাখি, তখন আর্মি "এক বুলেট - এক শত্রু" স্লোগান দিয়ে আপনাকে রক্ষা করার ওয়াদা করবে বটে, কিন্তু সে আর্মি নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হবে গুটিকতক মানুষের দ্বারা (রাজনীতিবিদ)। আর শয়তানের পক্ষে গোটা একটা জাতিকে কন্ট্রোল করার চেয়ে দুই-চারটা পলিটিশিয়ানকে কন্ট্রোল করা অনেক বেশি সহজ। সেটা জ্বীন শয়তানই হোক কি মানুষ শয়তানই হোক। তারপর সেই গোড়ায় দুই-চারটি পলিটিশিয়ান নষ্ট হয়ে গেলেই এক-বুলেট-এক-শত্রু হয়ে যাবে "এক-বুলেট-এক-বাঙালি"।
#রাজনীতি পর্ব - ১


এমনকি ২০০ বছর আগেও ইউরোপে এটার চর্চা ছিল। 'আদালত' বসে 'বিচার' করে 'দণ্ড' হিসেবে 'আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যু' রায় দেয়া হতো। এভাবে লক্ষাধিক 'বিচার' হয়েছে। হয়ত সে মহিলা বিধবা ছিল, চেহারা কুৎসিত ছিল, আর সেবছরে ফসল খারাপ হয়েছিল, সেটার দায় কুৎসিত দর্শন বুড়ির উপর চাপিয়ে তাকে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। কিংবা এমন আরো হাজারো ঘটনা...।

জাদুবিদ্যা/ কুফুরি কালাম মিথ্যা নয়; এই কম্পিউটারের যুগেও তা টিকে আছে। কিন্তু আপনাদের কি মনে হয় যে, ঐ লক্ষাধিক 'বিচার' আসলেই 'বিচার' ছিল?
সেসব 'আদালত', আসলেই আদালত ছিল?
সেসব 'বিচারক' আসলেই বিচারক ছিল?
সেসব 'দণ্ড', ন্যায়সঙ্গত দণ্ড ছিল?

যদি আপনার উত্তর 'না' হয়, তাহলে আরো কিছু আলোচনা করা যেতে পারে।
যদি বলেন, তারা 'অসভ্য' ছিল --
তাহলে আমি এযুগের মার্কিন আদালতের দিকে তাকাতে বলব --
যেখানে প্রতি বছর -- প্রতি বছর পুলিশ গুলি করে 'কালো' মানুষদের হত্যা করে, এবং আদালত সেসব পুলিশকে হয় 'শতভাগ নির্দোষ', কিংবা 'মাথায় সমস্যা' বলে ছেড়ে দেয় (সর্বশেষ ফিল্যান্ডো ক্যাস্টাই কেইস)।
কিংবা যখন বাংলাদেশে 'তুই রাজাকার' বলেই একটা মানুষকে ঝুলিয়ে দেয়া চলে।
কিংবা এক অভিযোগে সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সত্তুরটা মামলা হয়, আদালত প্রাঙ্গনে হামলা হয়, আর বিচার চাইতে গেলে বিচারক বলে: "আপনি আমার সামনে আসবেন না। আপনাকে আমি অপছন্দ করি।"
কিংবা মুক্তমনা (!) নাস্তিকদের স্বর্গরাজ্য জার্মানিতে এক লোক একজন মুসলিম নারীকে কটুক্তি করে, পরে সে মহিলা বিচার চাইতে গেলে তাকেই আদালত প্রাঙ্গনে ছুরি মেরে অন্তঃসত্তা অবস্থায় হত্যা করে, তারপর যখন সেই ইসলাম বিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয় না, কেবল ১৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয় (মারওয়া এল-শেরবিনি কেইস)।

তবু্ও যদি আপনি ডাইনি পুড়ানোকে অসভ্য, মধ্যযুগীয় বর্বরতা আখ্যা দিয়ে বর্তমান যুগকে 'সভ্য, আধুনিক যুগ' বলেন --
তবে আপনার সাথে আর আলোচনা না করে আমি আমার কথাটুকু বলব। আর তা হলো --

বিচারব্যবস্থা তথা আদালত পরিচালিত হয় মানুষের দ্বারা। সাধারণতঃ একটা সমাজের অধিকাংশ মানুষ যে ধরণের ন্যায়নীতি ধারণ করে, আদালত/ বিচারকেরাও সে নীতিতেই চলে। তাই দুই-তিনশ' বছর আগের ইউরোপিয়ান আদালতের 'বিচারকদের' বিবেক বলত জাদুকরী/ ডাইনিকে পুড়িয়ে মারাটাই ন্যায়বিচার (!)। কিংবা কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করে ধরা পড়লে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড (!) দেয়াটাই ছিল তাদের 'বিবেক'। আবার এই যামানায় এসে ইউরোপের দেশগুলোর বিবেক বলছে: কেউ হাজারটা খুন-ধর্ষণ করলেও তাকে সর্বোচ্চ এক যুগ কি দুই যুগ জেলে বন্দী করে রাখো (তথা যাবজ্জীবন দাও), কিন্তু মুত্যুদণ্ড দিও না, কারণ সেটা বড়ই 'নিষ্ঠুর'!

যেকোনো ন্যায়বান মানুষ, এবং যেকোনো ভারসাম্যপূর্ণ মুসলিম মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন যে, ইউরোপিয়ানরা আগে বেজায়গায় মৃত্যুদণ্ড দিত, আর এখন সঠিক জায়গায়ও মৃত্যুদণ্ড দেয় না। বস্তুতঃ, শয়তান মানুষকে এভাবেই একবার ডানে ও একবার বামে ঝুঁকিয়ে দেয়, কিন্তু ভারসাম্যে অবস্থান গ্রহণ করতে দেয় না। ফলস্বরূপ বিচারের নামে কখনো অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি (আত্মহত্যা প্রচেষ্টার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড) ও কখনোবা অতিরিক্ত শিথিলতা (হাজার খুন করলেও বড়জোর দুই-এক যুগ কারাদণ্ড) -- এর মাঝেই শয়তান তার অনুসারীদেরকে ঘুরিয়ে মারছে।

অবশ্য যারা বিবর্তনবাদী, তাদের এক্ষেত্রে আপত্তি করার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। কেননা, তাদের মতে মানুষ বিবর্তিত হয়ে ক্রমশঃ উন্নত বিবেক-বুদ্ধি-নৈতিকতা লাভ করছে। অতএব, সে হিসেবে বলতে হয়, ঐযুগে তাদের বিবেক যতটুকু ডেভেলপ করেছে, সে মোতাবেক তারা ডাইনি আখ্যা দিয়ে কুৎসিত বুড়িদের পুড়িয়ে মেরেছে -- তাদের 'বিবেক' ছিল ওটাই, অতএব, তাদের বিবেকের সাপেক্ষে তাদের কর্ম জাস্টিফাইড!!

এধরণের মানুষদের সাথে তর্ক করে আমরা সময় নষ্ট করব না। তাদেরকে আমরা বিচারকও মানি না, এবং তাদের কাছে নিজেদের অবস্থান জাস্টিফাইড প্রমান করার কোনো প্রয়োজনীয়তাও আমাদের নেই। আমরা কেবল এতটুকু বলব যে --

সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ পূর্ণমাত্রায় স্বচ্ছ বিবেক ও বিচারবুদ্ধির অধিকারী হিসেবে পৃথিবীতে যাত্রা শুরু করেছে। সে না ছিল কোনো বানর, আর না ছিল কোনো অসভ্য উলঙ্গ জংলী। কিন্তু কালের পরিক্রমায় মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে প্রবৃত্তি ও শয়তানের আনুগত্য করেছে। ফলস্বরূপ জেনারেশানের পর জেনারেশান অসভ্য হতে হতে উলঙ্গ জংলীতে পরিণত হয়েছে। আবার তাদের থেকেই হাজার জেনারেশান পার হয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি-পোশাকের যুগ তৈরী করেছে। আবার সেই যুগ থেকে এখন (একবিংশ শতাব্দীতে) পুনরায় নগ্নতা ও অবাধ যৌনাচারের যুগে ফিরে যাচ্ছে।

যুগযুগ ধর মানুষের 'বিবেক' বদলায়নি: বরং আমাদের দাবী হচ্ছে, মানুষের বিবেক আল্লাহ-প্রদত্ত নির্ভেজাল, খাঁটি একটি জিনিস। মানুষ এই বিবেককে অন্ধকার পর্দায় আবৃত করে ফেলে, এবং সেটাকেই তারা 'বিবেক' বলে দাবী করে, এবং --
সেই (অন্ধকার পর্দায় আচ্ছাদিত) 'বিবেক' ব্যবহার করে 'আদালত'-এ বসে ডাইনি পুড়ানোর 'দণ্ড' জারি করে, আত্মহত্যা করতে উদ্যত ব্যথিত মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, কিংবা আবার কখনো হাজারো খুন-ধর্ষণের অপরাধীকেও মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ছেড়ে দেয়।

এমতাবস্থায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়বান সমাজ পেতে হলে আমাদেরকে --
১. এমন অর্থনীতি, সমাজনীতি, পরিবারনীতি ও সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে, যেটা আমাদের জন্মগতভাবে প্রাপ্ত স্বচ্ছ বিবেককে শয়তানি পর্দা দ্বারা আচ্ছন্ন হতে দেবে না, এবং --
২. খোদাতায়ালা-প্রদত্ত বিধানকে আদালতের ভিত্তি করতে হবে।

এভাবে একটি প্রকৃত ন্যায়বান 'আদালত' পাওয়া যাবে, যার ইতিহাস পড়লে যেকোনো যুগের স্বচ্ছ বিবেকবান ন্যায়বান মানুষ সত্যায়ন করবে: হ্যাঁ, সেটাই ছিল শ্রেষ্ঠ বিচার, প্রকৃত ন্যায়বিচার।

আর তেমন আদালত ব্যবস্থাকে স্থায়ী ও টেকসই করতে হলে ব্যাপক গণভিত্তি প্রয়োজন। এমন জাতি প্রয়োজন, যাদের বিবেককে শয়তান নানান পর্দায় আচ্ছাদিত করে ফেলেনি। যাদের নিজেদের বিবেক বিশুদ্ধ কিতাব কুরআনের কাছাকাছি। ফলস্বরূপ কুরআনের শাসন কায়েম হলে, কুরআনের আদালত প্রতিষ্ঠা হলে সে জনগণ তা মেনে নেয়, আদালতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে না।

এটি একটি উভমুখী প্রক্রিয়া। কুরআনের শাসন ও বিচারব্যবস্থা যেমন জনগণের বিবেককে স্বচ্ছ রাখে; তেমনি যে জাতির বিবেক স্বচ্ছ, তাদের আদালতও ন্যায়বান হয়ে থাকে। একারণেই একটি ন্যায়বান-ধার্মিক জাতি হলো একটি ন্যায়বান বিচারব্যবস্থা (ও শাসনব্যবস্থা) পাবার পূর্বশর্ত।

#রাজনীতি পর্ব - ২


-- আচ্ছা! ওরা এদেশকে জঙ্গীরাষ্ট্র বানাতে চায়, সেটা আপনি আমাদেরকে শিখাচ্ছেন কেন? আমরা জনগণ, আমাদের কি বিচারবুদ্ধি নাই নাকি, আমাদের কি চোখ নাই নাকি, আমরা কি দেখি না?

না। আসলেই দেখি না। রাজনীতির সবচে' বড় খেলা এটাই: ব্রেইনওয়াশিং।
যেমন, আমেরিকার বহু মানুষ জানেও না ম্যাপে ইরাক/ ইরান এর অবস্থান কোথায়। কিন্তু মার্কিন সরকার তাদেরকে ভয় দেখায়: "ওরা সবাই আমেরিকায় হামলা করতে চায়, অতএব আমরাই আগে ওদের উপর হামলা করব, তোমরা জনগণ সরকারের সাপোর্টে থাকো।" এরপর বিভিন্ন দেশে হামলা করে তেল-গ্যাস চুরি করে নেয়।

এতো খুব সহজ ব্রেইনওয়াশিঙের উদাহরণ, যা আমরা সহজেই বুঝি। কিন্তু দেখুন:
মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের ভিত্তি যে কুরআন হওয়া উচিত, একথা সবাই মানবে না। এবং বাংলাদেশী মুসলমানদেরই একদল এটার বিরোধিতা করবে। কেন? কারণ তাদের ব্রেইন বিভিন্ন চেতনার নামে ওয়াশ করা হয়ে গেছে।

আরো সূক্ষ্ম ব্রেইনওয়াশিঙের উদাহরণ আছে। সেসব টানতে গেলে লেখা বড় হয়ে যাবে। যেমন দেখুন:
"এত পড়াশুনা করেছি কি বিয়ে করে স্বামীর গোলামী করার জন্য?"
-- আচ্ছা! নাতো, স্বামীর গোলামী নয়, কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের গোলামী করার জন্য!!
বিষয়টা শুনতে কটু হলেও বাস্তবতা এটাই যে, বর্তমান যুগের নামী-দামী কর্পোরেট জবগুলো আদতে নিচুস্তরের গোলামী ছাড়া কিছুই নয়। যারা হাই লেভেল কর্পোরেট জব করেন, তারা নিজেরাও মনে মনে এটা অনুভব করেন। তারা চাকরের মতই খাটুনি করেন, কিন্তু সেলফি তোমার সময় কেবল সুন্দর করে হাসি দেন। কিন্তু তবুও --
গৃহিনী হওয়াটা স্বামীর গোলামী, আর কর্পোরেট চাকরি করাটা বস/ প্রতিষ্ঠানের গোলামী নয়! ঐটা স্বাধীনতা!

এভাবে আমাদেরকে 'স্বাধীনতার' সংজ্ঞা শিখানো হয়।
না, এটা স্বাধীনতা না। সোশ্যাল স্ট্যাটাসের চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে কর্পোরেট জব করাটা 'নারী স্বাধীনতা' না।
পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের খপ্পর থেকে বের হয়ে বাংলাদেশী রাজনীতিবিদদের খপ্পরে আজীবন বন্দীত্বের নাম 'দেশপ্রেম' না, 'স্বাধীনতার চেতনা-ও' এটা না।

পশ্চিমা নারীরা যখন শীতে কাঁপতে থাকা সত্ত্বেও ঠ্যাং বের করে চলে, তখন সেটা অবশ্যই 'বন্দীত্ব', স্বাধীনতা নয়।

স্বাধীনতা কী? এইযে স্ব-অধীনতা, অর্থাৎ নিজের অধীনতা (নিজেই নিজের অধীন!!) -- এখানে আমরা জানতে চাই, স্ব/নিজ বলতে আপনারা কী বুঝাচ্ছেন? প্রতিটা মানুষের ভিতরে ভালো ও মন্দ দুটি সত্ত্বা থাকে। স্ব-অধীনতা বা স্বাধীনতা বলতে কি আপনারা একইসাথে ভালো ও মন্দ-- দুটির অধীন থাকা বুঝাচ্ছেন? নাকি স্ব-অধীনতা বলতে মানুষের প্রবৃত্তির অধীনতা বুঝাচ্ছেন? আপনিতো একইসাথে ডান ও বামদিকে যাত্রা করতে পারবেন না!

ইসলামে স্বাধীনতা আছে। তবে লাগামহীন স্বাধীনতা নয়। লাগামহীন স্বাধীনতাকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। স্বাধীনতার নাম করে বিশ্বব্যাপী আজ 'লাগামহীন স্বাধীনতা' চর্চার জোয়ার চলছে। এগুলো মূলতঃ স্বাধীনতার নামে প্রবৃত্তির দাসত্ব।

পক্ষান্তরে আমরা সেই স্বাধীনতার কথা বলি, যা মানুষের সদগুণাবলীকে বাধাহীনভাবে চর্চা করার সুযোগ দেয়। যেন মানুষ প্রভাবিত/ ব্রেইনওয়াশড না হয়ে বাধাহীনভাবে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে পারে, মুক্ত মনে চিন্তা করতে পারে। বিবেকের আহবানে যেকোনো মুহুর্তে সাড়া দিতে পারে।

এবং আমরা একইসাথে জানি যে, স্বচ্ছ বিচারবুদ্ধি ও বিবেক ইসলামকে গ্রহণ ও ধারণ করবেই। তখন জনগণ নিজে থেকেই কুরআনের সংবিধানের দাবী জানাবে। রাষ্ট্রপ্রধানেরা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হলেই তাদেরকে বিদায় করবে। ন্যায়বান শাসন-ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে।

স্বচ্ছ বিচারবুদ্ধির অধিকারী জনগণের বিচক্ষণতা উন্নত হয়। ফলে নেতা নির্বাচনের সময় তারা মুখ ও মুখোশের পার্থক্য করতে পারে। [ মুমিন (আলী) ও মুনাফিক (মুয়াবিয়া)-এর মাঝে পার্থক্য করতে পারে। ]

কুরআন সকলের জন্যই, শুধু আলেমদের জন্য নয়। কুরআন প্রতিটা মুসলমানকে সিটিজেন জার্নালিজম চর্চা করতে বলে, দুই পক্ষের কথা শুনে ন্যায়বিচার করতে বলে, কারো প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে ন্যায়বিচার থেকে সরে না যেতে সতর্ক করে, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব তার এবং জাতির সর্বোচ্চ সশস্ত্র নিরাপত্তা বিধানের কথা বলে, ধন-সম্পদের সুষম বন্টনে উপযুক্ত অর্থনীতির কথা বলে --
এবং এগুলো প্রতিটা মুসলমানের জন্যই। বিশেষভাবে কাজী/ বিচারকের জন্য নয়, বিশেষভাবে সামরিক বাহিনীর জন্য নয়, বিশেষভাবে সাংবাদিকদের জন্য নয় কিংবা অর্থনীতিবিদদের জন্য নয়।

ইসলাম প্রতিটা মুসলমানকে one man army হিসেবে দেখতে চায়। এমন একজন ব্যক্তি, যে ব্রেইনওয়াশিঙের শিকার হয় না, বরং জটিল বিশ্লেষণের মাধ্যমে মুখ-ও-মুখোশ আলাদা করে সত্য তুলে আনে; যে অর্থনীতি, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে। একইসাথে সে তার দৈনন্দিন জীবন-সংসারও চালিয়ে যায়। আর এমন ব্যক্তি হতে হলে অবশ্যই আমাদের 'স্বাধীনতার' চর্চা করা প্রয়োজন। তবে সেই লাগামীহন স্বাধীনতা নয়, যা স্বাধীনতার নামে প্রবৃত্তির দাসত্ব করায়; বরং সেই স্বাধীনতা, যা মানুষের বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও বিবেককে ক্ষুরধার করে তোলে।

আর এই 'পজিটিভ স্বাধীনতা' চর্চার মাধ্যমে আমরা এমন একটি জেনারেশান গড়ে তুলতে চাই, যারা তরুণ বয়সেই সত্যিকার সচেতন হবে। সচেতন হবে ভূ-রাজনীতি বিষয়ে, সচেতন হবে অর্থনীতি বিষয়ে, সচেতন হবে যুদ্ধ বিষয়ে। তারা জানবে, গোটা সিস্টেমটা কিভাবে কাজ করে। এবং তারপর তারা আর প্রতারিত হবে না।

We shall bring up a generation conscious. Conscious of land, warfare and economy. They shall know how the system works. And they will not be deceived.

#রাজনীতি পর্ব - ৩

পোস্ট আর্কাইভ: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1710725335717597


জাপানের ঘটনা। এমন আরো ঘটনা আছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, প্রতিবেশীরা পরস্পর যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। বছরের পর বছর একই লিফট দিয়ে উঠানামা করে, বহুবার দেখা হয়, কিন্তু ওটুকুই; এর বেশি আর কোনো চেনা-পরিচয় ঘটে না।

লক্ষ্য করবেন, বাংলাদেশে ঢাকা শহরে বর্তমানে অনুরূপ পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। একটা ছোট্ট এরিয়াতে ঘন বসতি: লাখ লাখ মানুষ বসবাস করছে। কিন্তু হাজার জনের ভিড়েও অনেকটা একা, বিচ্ছিন্নভাবে চলাফেরা করছে সবাই। কোথায় কার জন্ম হচ্ছে, কে মারা যাচ্ছে, কেবা খোঁজ রাখে!

একইসময়ে গ্রামগুলোতে ভিন্ন চিত্র। সেখানে মাতবর/ মোড়ল/ পঞ্চায়েত/ সমাজ ইত্যাদি থাকে। পঞ্চাশটা ঘর মিলে একটা সমাজ -- পরস্পরকে চেনে জানে, নিজেদের মধ্যে থেকে পাঁচ-সাতজনকে নেতা বানিয়ে বিচার-সালিস, গ্রামের উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয় মেইনটেইন করে।

লক্ষ্য করলে দেখবেন, এইযে অল্পকিছু মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের একজন মোড়ল/ মাতবর নির্বাচিত করে নিচ্ছে -- এই ব্যাপারটা শহরে নাই একারণে যে, শহরের জীবনযাত্রায় মোড়ল/ মাতবরের প্রয়োজন হয় না। দশটা গ্রামের দশজন মোড়ল একটা বিষয়ে একমত হলেই ধরে নেয়া যায় যে, ঐ দশটা গ্রামের মানুষই এতে একমত। কিন্তু শহরের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের মত আলাদাভাবে নিতে হয়।

এককালে আরবে গোত্র প্রথা চালু ছিল। গোত্রের নেতা যা বলত, সেটাই ঐ গোত্রের সকলের মতামত হতো। তাই যখন মদিনার ১২টি গোত্রের নেতারা মিলে মুহাম্মদ (সা.)-কে চিঠি দিয়ে সর্বোচ্চ নেতা মেনে নিল, তখন তিনি মদীনায় একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু আজকের এই ২ কোট মানুষের ঢাকা শহরে যদি নবী আসতেন, তাহলে কি হুবহু একই পদ্ধতিতে তাঁকে নেতৃত্বে আনা যেত? আপনি কি আমাকে গুলশান, বারিধারা, ধানমণ্ডি, মিরপুর ইত্যাদি এলাকা থেকে একজন করে এমন 'নেতা' এনে দিতে পারবেন, যে নেতার মতামতই তার এলাকার সব মানুষের মতামত?

না, এমনটা সম্ভব নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, হুবহু ঐ পদ্ধতিতে যদি আমরা 'সর্বোচ্চ নেতা' (প্রেসিডেন্ট/ রাজা/ প্রধানমন্ত্রী যা-ই বলেন না কেন) নির্বাচন করতে যাই, তাহলে তা ঢাকায় সম্ভব হবে না। কিন্তু গ্রামে সম্ভব হতে পারে। কেননা সেখানে প্রতিটা গ্রামের মাতবর/ মোড়ল হলো অনেকটা এক একটা গোত্রের নেতার মতন।

এই উদাহরণটা এজন্যে দিলাম যে, 'সমাজের স্ট্রাকচার' না বুঝে অনেকে বাংলার বুকে আরবের পোশাক, খাদ্য, এবং পারলে গোত্রীয় প্রথাকে কপি-পেস্ট করে বসিয়ে দিতে চান। অথচ তারা ভুলে যান যে, একই ইসলামের বাণী অসংখ্য নবী-রাসুলগণ নিয়ে এসেছেন এই পৃথিবীতে, আর একেক নবীর জনগণের সামাজিক স্ট্রাকচার একেক রকম ছিল!

ইসলাম হলো কিছু মূলনীতি, আর বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে তার বহিঃপ্রকাশ বিভিন্নভাবে ঘটে। তবে নীতি এক থাকে। অনেকটা একই বৃষ্টির পানি কোনো মাটিতে আম গাছ ফলায়, আবার কোনো মাটিতে বা আপেল!

রাসুল (সা.) যে প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন, সেটার নেতৃত্বে তিনি কিভাবে এসেছিলেন? কোন মূলনীতি তিনি অনুসরণ করেছিলেন? তাঁকে তো মক্কার প্রভাবশালী নেতারাও 'সর্বোচ্চ নেতা' হবার অফার দিয়েছিল, সেটা তিনি গ্রহণ করলেন না, কিন্তু মদীনার গোত্রপতিদের প্রস্তাব কেন গ্রহণ করলেন?

ইত্যাদি চিন্তাভাবনা করে আমাদেরকে মূলনীতিগুলো বের করে আনতে হবে। অতঃপর আমরা সেখান থেকে 'ইসলামী নেতৃত্বের পথ' সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরী করতে পারব, যা হবে 'আমাদের রাজনৈতিক পদ্ধতি'। তখন আমাদের আর প্রয়োজন হবে না পাশ্চাত্য থেকে ধার করা গণতন্ত্রের। কিংবা অন্য কারো থেকে ধার করা শাসনপদ্ধতি।
.........................................................................................
"গোত্রপতিদের মতামত মানেই প্রতিটা গোত্রের জনগণের মতামত, অতএব, মদীনাবাসীর (প্রায়) সবাই মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্ব চাইছে" -- এটাই ছিল সেই মূলনীতি। অর্থাৎ, (গোত্রপতিদের মাধ্যমে) "জনগণের দ্বারা নির্বাচিত"।
আর বর্তমান যুগে যেহেতু গোত্রীয় সিস্টেম নাই, সেহেতু "সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত"। মূলনীতি কিন্তু একই থাকছে।

অতএব, বৈধ নেতৃত্বের মৌলিক শর্ত হলো: "জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হতে হবে।"

এটাতো খুবই স্বাভাবিক কথা যে, যাকে আমি নেতা মানি না, সে কিভাবে আমাকে আদেশ করবে? এমনকি নবী-রাসুলগণও কারও উপর ধর্মীয় আইন প্রয়োগ করেননি, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজে থেকে ধর্ম গ্রহণ করে নবীকে সর্বোচ্চ নেতা মেনে নিচ্ছে।

এখানে সংক্ষেপে আর একটি কথা বলব। সেটা হলো, এইযে "জনগণ কর্তৃক নির্বাচন" (বা সংক্ষেপে ইলেকশান/ নির্বাচন), সেটা অবশ্যই সচেতন জনগণ কর্তৃক সচেতনভাবে ঘটতে হবে এবং সুষ্ঠুভাবে হতে হবে।

আর যদি তা না হয়?
পরবর্তী পর্বে 'মুখ ও মুখোশ' পদ্ধতিতে 'নির্বাচন ও নির্বাচনের ছলনা' বিষয়ে আলোচনা করব। তবে আজকের পর্ব থেকে কেবল এতটুকু মনে রাখা প্রয়োজন যে, বিভিন্ন সামাজিক স্ট্রাকচার (গোত্রীয়, কিংবা বিচ্ছিন্ন শহুরে নাগরিক)-এর ভিত্তিতে মতামত গ্রহণের পদ্ধতি বিভিন্ন হতে পারে (গোত্রপতিদের মতামত কিংবা গণভোটের মাধ্যমে), তবে বৈধ নেতৃত্বের মৌলিক শর্ত সর্বদা একই থাকে, আর তা হলো:
আপনাকে অবশ্যই জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হতে হবে।

#রাজনীতি পর্ব - ৪

পোস্ট আর্কাইভ: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1710725335717597

আপনারা জানেন যে, মিশরে বর্তমানে সেনা শাসন চলছে। জেনারেল সিসি সেখানে জনগণের মতামত নিয়ে তারপর ক্ষমতায় বসেননি। বরং আগে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে পরে একটা নির্বাচন দিয়ে নিজেকে 'বিপুল ভোটে বিজয়ী' ঘোষণা করেছেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ৯৭% ভোট পেয়েছেন!

আপনারা জানেন যে, আসলে নিরঙ্কুশ জনসমর্থন তার নাই। কিন্তু জনগণের ঘাড়ে আগে চেপে বসে তারপরে জোর করে ভোট আদায় করেছেন কিংবা আমাদের দেশের মত হাজার হাজার ব্যালটে নিজের লোক দিয়ে সিল বসিয়েছেন। এভাবে উনি "জনগণের দ্বারা সমর্থিত" (!) হয়ে গেলেন! তারপর ১৪০০ বছর পরে জেনারেল সিসির ভক্তরা ইতিহাস লিখবে: "মিশরের আপামর জনসাধারণ উনাকে বারবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছিলো...।"

History has been written by its victors -- বিজয়ীদের দ্বারাই ইতিহাস লিখিত হয়েছে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশেও তেমন ইতিহাস লেখা হচ্ছে (ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, চৌদ্দ কোটি মোবাইল, গুগল, ফেইসবুক, ইন্টারনেট -- এগুলো কে দিয়েছে? থ্রিজি কার স্বপ্ন ছিল? ইত্যাদি।)

গত পর্বের থেকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, বৈধ নেতৃত্বের শর্ত হলো: "আপনাকে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হতে হবে।"
কিভাবে?
১. আগে জনগণ মতামত দেবে (কে নেতা হবে, সে বিষয়ে)
২. তারপরে নেতা ক্ষমতায় বসবেন (রাজদণ্ড হাতে নেবেন / গদিতে বসবেন)

এর উল্টা হলে কিন্তু সেই শাসন আসলে নৈতিক দিক থেকে বৈধ থাকে না। যেমন জেনারেল সিসি:
১. আগে কৌশল করে/ গায়ের জোরে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেছে
২. তারপর জনগণের সম্মতি আদায় করেছে (সাজানো নির্বাচনে জেনারেল সিসির পক্ষে ৯৭% ভোট ঘোষণা হয়েছে)।
আর এটাতো খুবই স্বাভাবিক যে, আপনার হাতে যখন পুলিশ, আর্মি ও প্রশাসন, তখন বন্দুক না ধরলেও জনগণ নীরবেই মেনে নেবে আপনাকে, এমনকি প্রয়োজনে আপনার পক্ষে স্লোগানও দেবে!
তারপর ১৪০০ বছর পর সেই ইতিহাস যদি মানুষ পড়ে: "লক্ষ লক্ষ লোক তার সমর্থনে মিছিল করেছিল, স্লোগান দিয়েছিলো...।" তখন আসলেই কি সেটা বৈধ শাসনে পরিণত হবে?

না। রাজনীতি ও ক্ষমতা সংক্রান্ত ইতিহাস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আপনাকে খুবই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী দৃষ্টির অধিকারী হতে হবে। ক্ষমতার লড়াই করা লোকেরা যতটা ধুরন্ধর, মুখোশধারী, চালাক, মিথ্যেবাদী, ধোঁকাবাজ, মুনাফেক ইত্যাদি হতে পারে, আপনাকেও নিজের ব্রেইনের ভিতরে সেইরকমভাবে চিন্তা করতে পারতে হবে। নাহলে আপনি মুনাফিক শনাক্ত করতে পারবেন না। মাথায় কালো পট্টি আর হাতে তসবিহ দেখলেই গলে যাবেন। কিংবা সাদা দাড়ি আর পাগড়ি!

আপনাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হতে হলে অবশ্যই মুখোশধারী শনাক্ত করতে পারতে হবে। আর মুসলমানদের ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে? আপনাকে মুনাফিক চিনতে পারতে হবে। সেইসাতে মুখোশধারী, ভণ্ড, ধোঁকাবাজ, ধর্মব্যবসায়ী, ক্ষমতালোভী -- ইত্যাদি শনাক্ত করার যোগ্যতা তো থাকতেই হবে।

ক্ষমতালোভী শাসকেরা জনগণকে তুষ্ট রাখতে অনেক দান-সদকা করে। মসজিদ-মাদ্রাসা করে দেয়। কোরান তেলাওয়াত করে, আজান দেয়, তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে। কিন্তু সেটা আসলে চালাকি।
অপরদিকে ন্যায়বান শাসকেরাও দান-সদকা করে। মসজিদ-মাদ্রাসা করে দেয়। কোরান তেলাওয়াত করে, আজান দেয়, তাহাজ্জুদ নামাজও পড়ে। কিন্তু সেটা করে আল্লাহর জন্য। দেখতে বাইরে থেকে একইরকম। কিন্তু ভিতরে দুইজন দুইরকম।

চোরও নামাজ পড়ে, সাধুও নামাজ পড়ে। পার্থক্য করার যোগ্যতা যে জাতির থাকে না, তার কপালে ঐ চোরই জোটে। কারণ ভণ্ড লোকের নামাজটা একটু বেশিই দেখা যায়।আফসোস! আমরা মুসলিম উম্মাহ ধর্ম নিয়ে আবেগী হতে শিখেছি, কিন্তু ক্ষুরধার মস্তিষ্কের অধিকারী হয়ে মুনাফিক শনাক্ত করতে শিখিনি।


(আজ এতটুকুই থাক। এপর্যন্ত আমরা বৈধ নেতৃত্বের যত দিক নিয়ে আলোচনা করেছি, পরের পর্বে সেসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসের উপর আলোকপাত করব, ইনশাআল্লাহ।)

#আমাদের_রাজনীতি - ৫

পোস্ট আর্কাইভ: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1710725335717597


আমরা সেই ব্যক্তিদেরকে সম্মান করি, যারা যুক্তি ও আবেগের স্ব-স্ব অবস্থান বুঝতে পারেন। যারা আবেগ দ্বারা যুক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেন না। আবার বেজায়গায় (যেমন প্রেম, ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা, ইত্যাদিতে) যুক্তির চর্চা করতে যান না। একথা এজন্যে বললাম যে, ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলে অধিকাংশ মুসলমান 'আবেগী বাক্যকে' যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। অথচ রাজনীতির বিশ্লেষণে আবেগের স্থান থাকতে পারে না। বরং রাজনীতির বিশ্লেষণে যারা আবেগ নিয়ে আসেন, তারা মূলতঃ রাজনীতির স্বার্থেই সেটা করে থাকেন। কেননা আবেগের ঘোলা চশমা জনগণের চোখে পরিয়ে দিলে মাছ শিকার করাটা সহজ হয়।
১. মুহাম্মদ (সা.)-কে মদীনার (১২টি গোত্রের) গোত্রপতিরা আহবান জানান মদীনার শাসক হবার জন্য। তারপর মুহাম্মদ (সা.) সেখানে যান এবং একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। মদীনাবাসীরা ও মক্কা থেকে আসা মুসলমানেরা মিলেমিশে বসবাস শুরু করেন।
[বিশ্লেষণ: আগে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে (গোত্রপতিদের মাধ্যমে) নেতা নির্বাচন করেছে। তারপর নেতা শাসনভার গ্রহণ করেছেন। অতএব, পুরো প্রসেসটা নৈতিক বিচারে সঠিক ছিল।]
২. মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের সময় মদীনাতে অলরেডি একটি রাষ্ট্র ছিল। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের সংবাদ শোনার পর জনগণের একাংশ (মদীনার পুরনো অধিবাসীদের মাঝে দুটি গোত্রের নেতারা) সকিফা নামক একটি স্থানে সমবেত হলেন। উদ্দেশ্য: নতুন একজন নেতা নির্বাচন করা।
[আবেগী প্রশ্ন: যে নবী আপনাদের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়, তার পবিত্র দেহকে মাটিতে শোয়ানোর আগেই আপনারা কিভাবে পারলেন ক্ষমতার ভাগাভাগিতে বসে যেতে? কিভাবে পারলেন তাঁর লাশ ফেলে রেখে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে ছুটে যেতে?]
যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণ: সকল গোত্রপতিকে সাথে নিয়ে আলোচনায় বসা হয়নি। অথচ তারাই দশ বছর আগে সকল গোত্রপতি মিলে (মুহাম্মদ (সা.-কে)) নেতা নির্বাচন করেছিলেন! তাহলে সেই তারাই (মদীনার পুরনো অধিবাসীদের একাংশ) কেন আজকে মাত্র দুটি গোত্র মিলে নতুন একজনকে নেতা ঘোষণা করে দেবার পাঁয়তারা করলেন? কারণ সম্ভবতঃ এটা হয়ে থাকবে যে, মুহাম্মদ (সা.) যে রাষ্ট্র রেখে গিয়েছিলেন, সেটা বেশ 'লোভনীয়' ছিল: কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল (সরকারি ফান্ড), আরবে ক্রমবর্ধমান প্রভাব, সুগঠিত আর্মি, ইত্যাদি।
উমার ইবনুল খাত্তাব (মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম সঙ্গী) জানতে পারলেন যে, মুহাম্মদ (সা,)-এর একক রাষ্ট্র সম্ভবতঃ দ্বিখণ্ডিত হতে যাচ্ছে, বা নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
[উৎসুক প্রশ্ন: এই সংবাদ উনার কাছেই কেন আগে আসলো? অন্য কোনো ব্যক্তি, যেমন, আলী (আ.) -- তাঁর কাছে কেন এলো না? সংবাদবাহক উনাকেই কেন 'গণ্ডগোলের' খবর দিলেন?]
তারপর উমার, আবু বকরকে ডেকে নিয়ে সেই সকিফা নামক এলাকায় চলে যান।
[আবেগী প্রশ্ন: কিভাবে পারলেন প্রিয় নবীজীর দাফন-কাফন ফেলে রেখে...]
তারপর সেখানে বহু বাকবিতণ্ডা উত্তেজনার পর এক পর্যায়ে উমার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আবু বকরের হাতে বায়াত নিলাম (নেতৃত্ব মেনে নেবার ওয়াদা করলাম)। এরপর সেখানের বাকিরাও মেনে নিলো। তারপর তারা ফিরে এলেন। একটি মসজিদে ঘোষণা করা হলো: আবু বকর হলেন 'খলিফা'। তারপর ধাপে ধাপে জনগণকে জানানো হলো তাদের নতুন নেতার নাম।
[বিশ্লেষণ: সর্বস্তরের জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন হয়নি।
জনগণের মতামত সরাসরি ভোটের মাধ্যমেও নেয়া যেত, কিংবা সকল গোত্রপতিকে একত্র করে তাদের মাধ্যমে জনগণের মতামত নেয়া যেত। এর কোনোটিই হয়নি। আগে ক্ষমতা দখল হয়েছে, পরে জনগণকে বলা হয়েছে: ওমুকই এখন নেতা, তার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ মানে রাষ্ট্রদ্রোহ!]
৩. ইসলামী রাষ্ট্রের এই দ্বিতীয় শাসক আবু বকর তাঁর ইন্তেকালের সময় উমার ইবনুল খাত্তাবকে পরবর্তী নেতা ঘোষণা করে যান।
[উৎসুক প্রশ্ন: উমারের বুদ্ধি ও হস্তক্ষেপেই তিনি ক্ষমতায় বসেছিলেন, উমার ছিলেন তাঁর right-hand man। সেই কৃতজ্ঞতা ও ঋণ শোধ হিসেবেই কি তাকে পরবর্তী ক্ষমতা দিয়ে যাওয়া?]
[বিশ্লেষণ: জনগণের মতামতের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন হয়নি। মতামত দেবার কোনো সুযোগও দেয়া হয়নি।]
৪. উমার ইবনুল খাত্তাব তাঁর ইন্তেকালের সময় ৬-সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে যান এবং বলেন যে, এই কমিটির ভিতর থেকেই একজনকে পরবর্তী নেতা ('খলিফা') হতে হবে। সেই ছয়জনের মাঝে একজন ছিলেন উসমান, আরেকজন ছিলেন আলী (আ.)। কমিটির চেয়ারম্যান আলী (আ.)-কে নেতৃত্বের ভার গ্রহণের শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাব দিলেন: "কুরআন, রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ ও প্রথম দুই 'খলিফা' (আবু বকর ও উমার) এর কার্যনীতি অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে।"
আলী (আ.) রাজি হলেন না। বললেন, "আমি কুরআন, রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ ও তারপর আমার নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করব।"
[উৎসুক প্রশ্ন: হযরত আলী (আ.) কেন আবু বকর ও উমার এর কর্মনীতিকে কুরআন ও সুন্নাহর পাশাপাশি গ্রহণ করতে রাজি হলেন না?
কারণ-১: প্রথম দুই খলিফার কর্মনীতি কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক ছিল?
কারণ-২: প্রথম দুই খলিফার কর্মনীতি কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক ছিল না, কিন্তু আলী (আ.) ক্ষমতায় বসে নিজের সুবিধাজনক নিয়মে দেশ চালাতে চেয়েছিলেন, আর প্রথম দুই খলিফার নীতি মানতে গেলে উনি ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারতেন না? কিন্তু তাহলে কুরআন-সুন্নাহকে কেন গ্রহণ করলেন? কুরআন-সুন্নাহ মানতে গেলে তো ক্ষমতার অপব্যবহার করা যাবে না! আর ক্ষমতায় আগে বসে নিয়ে পরে অপব্যবহার করার দুরভিসন্ধি যদি উনার থাকত, তাহলে তো উনি যেকোনো শর্তেই হ্যাঁ বলে দ্রুত ক্ষমতা বাগিয়ে নিতেন আগে।
তাহলে এই দ্বিতীয় কারণ গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। তাহলে খুব সম্ভবতঃ ১ম কারণটিই হয়ে থাকবে। আর সেটা হলো: কিছু কিছু ক্ষেত্রে "কুরআন, মুহাম্মদ (সা.), আবু বকর, উমার" -- এই চারটিকে একত্রে মানা সম্ভব না। প্রথম দুই খলিফার কর্মনীতি অনুসরণ করলে কিছু ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক হবার রিস্ক ছিল। তবুও আলী (আ.) কুরআন-সুন্নাহর সাথে কম্প্রোমাইজ করলেন না, যদিও এজন্যে তিনি ক্ষমতায় বসতে পারলেন না!
অবশ্য অনেকে বলবেন, তিনি আগে ক্ষমতায় বসে নিয়ে তারপর দুই খলিফার কুরআনবিরোধী নীতিগুলো বাতিল করে দিতে পারতেন। (অর্থাৎ, "যেনতেনভাবে ক্ষমতায় আগে যেয়ে নেই, পরে কুরআনের শাসন কায়েম করব" -- এই নীতি, যেটা আমাদের দেশের অনেক ইসলামী দলের নীতি।)। কিন্তু সেক্ষেত্রে তিনি ওয়াদা ভঙ্গকারীতে পরিণত হতেন।]
অতঃপর উসমান সেই শর্তে রাজি হয়ে গেলেন। তিনি হলেন 'খলিফা' টাইটেলধারী তৃতীয় শাসক।
[বিশ্লেষণ: জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচিত হয়নি। মতামত দেবার সুযোগও দেয়া হয়নি।]
৫. উসমানের শাসনকালে তিনি গোটা রাষ্ট্রকে ব্যাপক পারিবারিকীকরণ করেন এবং এক পর্যায়ে একদল ক্ষুব্ধ জনতার হাতে নিহত হন। উত্তেজিত জনতা কয়েকদিন মদীনার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ালো: "পরবর্তী নেতা নির্ধারণ না করে আমরা যাবো না।" কেউ নিজে থেকে নেতা হতে এগিয়ে আসলো না। পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে থাকলে সেই উত্তেজিত জনতা ও মদীনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বারংবার অনুরোধে অবশেষে আলী (আ.) শাসনভার গ্রহণ করতে রাজি হলেন।
[বিশ্লেষণ: "সকল জনগণ" কর্তৃক "শান্তভাবে" ভোট প্রদান কিংবা ধীর-স্থির আলোচনার মাধ্যমে গোত্রপতিদের দ্বারা নেতা নির্বাচন হয়নি।
যে উত্তেজিত জনতা উসমানকে হত্যা করেছিল, তারা মদীনার রাস্তায় কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছে, মানুষ ভীত ছিল। দেশে কোনো শান্তির অবস্থা ছিল না। পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে গড়ানো থেকে বাঁচতে ঐ মুহুর্তে জনগণ আলী (আ.)-কে নেতা বানিয়েছে। অথচ এই আলী (আ.)-ই তাদের মাঝে ২৫ বছর যাবত ছিলেন! সম্ভবতঃ আলীর (আ.)-এর গুণ, যোগ্যতা, ইখলাস (কুরআন-সুন্নাহর ব্যাপারে আপোষহীন) ইত্যাদি দেখে জনগণ তাকে নেতা নির্বাচন করেনি। খুব সম্ভবতঃ নৈরাজ্য থেকে বাঁচতেই আলী (আ.)-কে নেতা করেছিলো।]
(পরবর্তী পর্বে মুয়াবিয়া ও এজিদ পর্যন্ত আলোচনা করে 'ইসলামী শাসনপদ্ধতি'-র আলোচনায় চলে যাব, ইনশাআল্লাহ।)
#আমাদের_রাজনীতি - ৬
পোস্ট আর্কাইভ: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1710725335717597

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকালের সময় মুহাম্মদ (সা.) একটি দশ বছরের শিশু রাষ্ট্র রেখে যান। গোত্রপ্রথায় অভ্যস্ত আরবদের কাছে 'আধুনিক রাষ্ট্র' একটি নিতান্তই নতুন কনসেপ্ট ছিল। এই নতুন সিস্টেম অতি দ্রুত বুঝে নিয়ে তাতে পাকা খেলোয়াড় হয়ে ওঠা -- এটা কোনো সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু সেই কাজটি পেরেছিল মুয়াবিয়া।

দ্বিতীয় খলিফা উমার তাকে সিরিয়ার গভর্নর নিয়োগ করেন। তিনি টানা ২২ বছর সিরিয়ার গভর্নর পদে থাকেন:
প্রথম ৫ বছর উমারের শাসনামলে,
পরবর্তী ১২ বছর উসমানের শাসনামলে,
পরবর্তী ৫ বছর আলী (আ.)-এর শাসনামলে।

মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে তৃতীয় খলিফা উসমান পর্যন্ত রাজধানী ছিল মদীনা। চতুর্থ খলিফা আলী (আ.) রাজধানীকে কুফা নগরীতে স্থানান্তর করেন। তাঁর শাহাদাতের পর কুফায় ইমাম হাসান (আ.) মসজিদে ভাষণ দিয়ে নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন, ওদিকে সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া ইমাম হাসান (আ.)-এর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসলো।

[বিশ্লেষণ: ইমাম হাসান (আ.)-কে গোটা দেশের 'সকল জনগণ' প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোট দেয়নি (কেননা, মুয়াবিয়ার বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী তাঁর পক্ষে ছিল না)।
অপরদিকে মুয়াবিয়াকেও গোটা দেশের 'সকল জনগণ' প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোট দেয়নি (কেননা, ইমাম হাসান (আ.)-এর সমর্থকেরা মুয়াবিয়ার পক্ষে ছিল না)।
এমতাবস্থায় এক দেশ-দুই রাজা, এমন পরিস্থিতি তৈরী হলো।]

ক্ষমতার জন্যে মুয়াবিয়া চতুর্থ খলিফা আলী (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পর্যন্ত করেছিল। আর এত সহজেই সেই ক্ষমতা আলীর ছেলে হাসানের হাতে ছেড়ে দেবে?
ইমাম হাসান (আ.)-এর বিরুদ্ধেও সে সৈন্য জড়ো করলো। ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধিচুক্তি করে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন, মদীনায় নিভৃত জীবন যাপনে চলে গেলেন।

সিরিয়াতে ২২ বছর গভর্নর থাকায় মুয়াবিয়া সেখানে কার্যতঃ রাজা সেজে বসেছিল বহু আগেই। এখন আরো প্রায় ২০ বছর শাসন করে মৃত্যুর আগে নিজের ছেলে এজিদকে ক্ষমতায় বসিয়ে গেল। প্রায় চল্লিশ বছর ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করে নিজের ছেলেকে পরবর্তী রাজা বানিয়ে দিয়ে গেল। এই এজিদের বাহিনীর হাতেই কারবালায় শহীদ হলেন ইমাম হুসাইন (আ.)।

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে তলা আল বাদরু আলাইনা (আজ পূর্ণ জোছনা..) গানের মাধ্যমে যেই মুহাম্মদ (সা.) কে মদীনায় বরণ করে নেয়া হয়েছিল, ৫৮ বছরের মাথায় সেই মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতিকে হত্যার মাধ্যমে 'প্রতিশোধ' নেয়া হলো। দেয়া হলো ভালোবাসার প্রতিদান!

সে আবেগকে সংযত করে মূল বিশ্লেষণে ফিরে যাই। তো, এইযে এজিদ ক্ষমতায় বসলো, সেখানেও জনগণের মতামতের কোনো সুযোগ ছিল না।

১. মুহাম্মদ (সা.)
২. আবু বকর
৩. উমার
৪. উসমান
৫. আলী (আ.)
৬. মুয়াবিয়া
৭. এজিদ

ইসলামী রাষ্ট্রের এই সাতজন শাসকের মাঝে কেবলমাত্র মুহাম্মদ (সা.) ও আলী (আ.) জনগণের আহবানের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেছিলেন। বাকিরা নানান পদ্ধতি ও কলাকৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসেছিলেন, যাতে সর্বস্তরের জনতার মতামত প্রতিফলিত হয়নি। যেকোনো মুসলমান, যে তার চোখ থেকে শিয়া-সুন্নি আবেগের ঘোলাটে চশমা খুলতে পেরেছে, সে এই বাস্তবতাটা বুঝতে পারবে যে।

এতো গেলো রাজনীতির সাধারণ বিশ্লেষণ। তবে একইসাথে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি আলোচনা করা প্রয়োজন। কেননা, তারা 'মুসলমান' ছিলেন, এবং 'ইসলাম' অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন (কিংবা ইসলামকে ব্যবহার করে ক্ষমতার রাজনীতি করেছেন)।

ইসলাম আসলে কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়?
ইসলামে নেতৃত্বের পদ্ধতি আসলে কেমন?
এটা কি সকল যুগের জন্য ১০০% কঠোর, অপরিবর্তনীয়?
নাকি কিছু মূলনীতি ঠিক রেখে যুগ, সমাজ ইত্যাদির সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে?
ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করব সামনের পোস্টে, ইনশাআল্লাহ।

#আমাদের_রাজনীতি - ৭

পোস্ট আর্কাইভ: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1710725335717597


এপর্যন্ত আমরা যা আলোচনা করেছি, তার সারকথা হলো, আগে জনগণ মতামত দেবে, কেবল তার পরেই একজন নেতা শাসনভার গ্রহণ করবেন। আর সেই বিচারে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দিককার শাসকদের মাঝে প্রথমে মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরে আলী (আ.)-কেই শুধু আমরা 'ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতিতে ক্ষমতা গ্রহণকারী নেতা' হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

আরো একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, এইযে জনগণের মতামত, সেটা আমরা কিভাবে পাচ্ছি?

১. প্রত্যক্ষ ভোট। সারা দেশের সকল জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে একজনকে সর্বোচ্চ নেতা (প্রধানমন্ত্রী/ প্রেসিডেন্ট) নির্বাচন করা।
২. পরোক্ষ ভোট। গোটা দেশ থেকে প্রতি এলাকায় একজন করে প্রাথমিক নেতা (এমপি) নির্বাচন করা; তারপর সেই প্রাথমিক নেতারা মিলে সর্বোচ্চ নেতা (প্রধামন্ত্রী/ প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত করা। কিংবা দশটা গোত্রের / গ্রামের দশজন গোত্রপতি/ মোড়ল নির্বাচন করা, তারপর সেই দশজন গোত্রপতি / মোড়ল মিলে একজন সর্বোচ্চ নেতা (প্রধানমন্ত্রী/ প্রেসিডেন্ট) নির্বাচন করা।
এবং আরো নানাভাবে পরোক্ষ ভোট/ মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে।

কিন্তু এই পরোক্ষ ভোটের কিছু রিস্কও আছে। যদি এমপি/ গোত্রনেতা/ মোড়ল সবাই আসলেই জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচিত হয় তো ভালো কথা। কিন্তু যদি তারা ভোট কারচুপি করে/ গায়ের জোর দেখিয়ে/ গ্রামের লোকজনকে প্যাঁচে ফেলে এমপি/ গোত্রনেতা/ মোড়ল সেজে বসে? তারপর তারা মিলে আরেকটা খারাপ লোককে সর্বোচ্চ নেতা (প্রধামন্ত্রী/ প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত করে? এই রিস্কটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

অতএব, অনেক মুসলমান যে বলে থাকেন, "ইসলামে ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন নাই -- উম্মাহর (তথা জনগণের) প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতেই খলিফা (তথা সর্বোচ্চ নেতা) নির্বাচিত হবেন" --
তাদেরকে আমরা প্রশ্ন করতে চাই -- আপনার উম্মাহর এই 'প্রভাবশালী ব্যক্তিরা' কি জনগণের ভালোবাসাসিক্ত প্রভাবশালী, নাকি জনগণকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে পলিটিক্স করা প্রভাবশালী?

যাহোক, রাসুল (সা.) পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন (১২টা গোত্রের নেতাদের মাধ্যমে)। তবে সেখানে যে আসলেই জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়েছিল, সেটা সেই গান গেয়ে স্বাগত জানানো ও পরবর্তী ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি। আর হযরত আলী (আ.) প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন: সর্বস্তরের জনগণ (ও নেতৃস্থানীয় লোকদের) বারংবার অনুরোধে শেষমেষ তিনি 'খলিফা' পদ গ্রহণ করেন। কিন্তু আবু বকর, উমর, উসমান, মুয়াবিয়া ও এজিদ -- তারা না জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ক্ষমতায় বসেছিলেন, আর না পরোক্ষ ভোটে ক্ষমতায় বসেছিলেন। তারা যে কিভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন, তা বিগত পর্বগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ করেছি।
.........................................................................

'মানব-সমাজ' একটি গতিশীল জিনিস। নানান যুগে এটি নানান স্ট্রাকচার গ্রহণ করতে পারে। ১৪০০ বছর আগে এই আরবেই 'গোত্রীয় সামাজিক স্ট্রাকচার' ছিল, যা আজ আর নেই। এই বাংলাদেশেই একসময় জমিদার-কেন্দ্রিক সামাজিক স্ট্রাকচার ছিল, যা আজ আর নেই। বহু দেশে রাজা-প্রজা ভিত্তিক সামাজিক স্ট্রাকচার ছিল, আছে। একই সময়ে বাংলাদেশে ঢাকা শহরে 'কেন্দ্রীয় নেতৃত্ববিহীন নাগরিক সমাজ' বসবাস করছে, কিন্তু গ্রামগুলোতে আবার মোড়ল/ মাতবর এর অধীনে বসবাস করছে।

ভবিষ্যতে আরো নানারকম সামাজিক স্ট্রাকচার আসতে পারে। বিভিন্ন সামাজিক স্ট্রাকচারে জনমত গ্রহণ/ যাচাইয়ের বিভিন্ন উপায় থাকতে পারে (যেমন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোট)। কিন্তু সকল সামাজিক স্ট্রাকচারের মাঝেই আমাদের মূলনীতি এক থাকবে, আর তা হলো: জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচিত হওয়া। আর সেই মূলনীতি দিয়ে আমরা ১৪০০ বছর আগের ইতিহাস যেমন যাচাই করে বলতে পারি কারা ন্যায়সঙ্গত উপায়ে শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি আজকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান-ইরাক কিংবা সৌদি আরবে কারা ন্যায়সঙ্গতভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছে, তাও বিচার করতে পারি।

এই যোগ্যতাটা আমাদের সকলের থাকা প্রয়োজন। তা না করে যদি সুন্নিরা কেবল 'আবু বকর কর্তৃক নামাজে ইমামতি' আর শিয়ারা কেবল 'গাদীরে খুমের হাদীস' এর চর্চা করেন, তাহলে দৃষ্টিভঙ্গি প্রশস্ত হবে না। বর্তমান যুগের সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। অথচ কারবালার মাজলুমের সমর্থন করা মানে শুধু অশ্রুপাত নয়, বরং বর্তমান যুগের হুসাইনি কাফেলাকে রক্ষা করা, বর্তমান যুগের মুখোশধারী এজিদী শাসনগুলোর শেকড় উপড়ে ফেলা, এবং একটি খাঁটি ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা, যেন আরো হাজারো কারবালা ঘটে যাওয়া থেকে আমরা বাঁচতে পারি। আর সেজন্যেই এই ধীর-স্থির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ।

[পরবর্তী পর্ব: রাসুল (সা.) কেন সুনির্দিষ্টভাবে 'ইসলামী সংবিধানে পরবর্তী নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া' লিখে দিয়ে যাননি? নাকি তিনি লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন? তবুও কেন তিনি জোর করে লিখে দিয়ে গেলেন না? এর পেছনে তাঁর কোন wisdom (হিকমাহ, প্রজ্ঞা) কাজ করেছিল? এবং ইমাম আলী (আ.)-কর্তৃক নিজের ন্যায়সঙ্গত দাবী থেকে সরে আসার পিছনেইবা কোন প্রজ্ঞা কাজ করেছিল?
দুষ্টলোকের সমালোচনায় ব্যস্ত না থেকে বরং মুহাম্মদ (সা.) ও ইমাম আলী (আ.)-এর কর্ম থেকে কিছু হেকমত (wisdom, প্রজ্ঞা) যদি আমরা শিক্ষা করতে পারি, তবেই এসকল আলোচনা সার্থক হবে।]

#আমাদের_রাজনীতি - ৮

পোস্ট আর্কাইভ: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1710725335717597

আমরা ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখি যে, বিগত ১৪০০ বছরে মুসলিম জাতি শাসনব্যবস্থা প্রসঙ্গে কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেনি। আজও পৃথিবীব্যাপী মুসলিম বিশ্ব শাসিত হচ্ছে হয় রাজতন্ত্র দ্বারা, নয়তো পশ্চিমা গণতন্ত্র দ্বারা, কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত এলোমেলো অবস্থায়, যেটাকে নৈরাজ্য (anarchy) বলে। রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের পরে গোটা মুসলিম উম্মাহকে যারা শাসন করেছেন, সেই আবু বকর-উমর-উসমান-আলী ও তারপর মুয়াবিয়া-এজিদ -- তারা ৬ জন ক্ষমতায় অধিষ্ঠান হয়েছেন ৬ রকম পদ্ধতিতে, রাষ্ট্র পরিচালনাও করেছেন ভিন্ন ভিন্নভাবে, এবং তারপর থেকে মুসলিম জাতি নানান রূপের রাজতন্ত্রের কবলে পড়ে গেছে।

যেকোনো বিশ্লেষকের এটা মনে আসা স্বাভাবিক যে, যেই মুহাম্মদ (সা.) সুনির্দিষ্ট অর্থনীতি, পরিবারনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি আইন প্রণয়ন করে গেলেন, তিনি কেন রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট লেআউট দিয়ে গেলেন না? এর উত্তর আমরা একটু পরে সন্ধান করব। তার আগে একটি ইতিহাস উল্লেখ করা প্রয়োজন।

১. গাদিরে খুম: রাসুল (সা.) তাঁর জীবনের শেষ হজ্জ্ব শেষে ফেরার পথে গাদিরে খুম নামক স্থানে সোয়া লক্ষ সাহাবীর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, এবং সেখানে হযরত আলী (আ.)-এর হাত উঁচু করে ধরে ঘোষণা করেন: "আমি যার মাওলা, অতঃপর এই আলী তার মাওলা।" এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মুমিনদের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা সিলেক্ট করে দিয়ে যান। অতএব, রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুমিনদের নেতা নির্বাচন করার কোনো প্রয়োজন পড়বে না। একারণেই রাসুল (সা.) সুনির্দিষ্টি সুলিখিত 'নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া' দিয়ে যাননি।

যাহোক, মুমিনদের 'মাওলা' হিসেবে রাসুল (সা.)-এর যতগুলো দায়িত্ব ও অধিকার ছিল, তা কেবলমাত্র রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না। খোদামুখী আধ্যাত্মিক যাত্রার উপযোগী করে দুনিয়াবী সকল বিষয়ে মুমিনদেরকে গাইড করা এবং 'মুমিনদের জীবনের উপর অধিকার' মাওলাইয়াত-এর ভিতরে নিহিত ছিল। 'মাওলা' পদটির যে সার্বিক দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড তার একটি অংশ মাত্র। যখন সেটার উপযুক্ত পরিবেশ (মদীনায়) সৃষ্টি হয়েছে, তখন রাসুল (সা.) সেই দায়িত্বটিও পালন করেছেন। কিন্তু এর বাইরেও 'মাওলা' পদটির দায়িত্ব ও বিস্তৃতি অনেক বেশি। আর পরবর্তীতে এই পদটিই হযরত আলী (আ.) গ্রহণ করবেন -- রাসুল (সা.) সেই মনোনয়ন দিয়ে গিয়েছিলেন।

প্রশ্ন: রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের পর হযরত আলী (আ.) যখন জানতে পারলেন যে, কয়েকজন মানুষ একত্রিত হয়ে আবু বকরকে নেতা নির্বাচিত করেছে, তখন তিনি কেন এনিয়ে কোনো কথা বললেন না? তিনি কেন নিজের পদ দাবী করলেন না? এর উত্তর আমরা একটু পরে সন্ধান করব। তার আগে আরো একটি ইতিহাস উল্লেখ করা প্রয়োজন।

২. বৃহস্পতিবারের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা: এই ঘটনাটি গাদীরে খুমে মওলা আলী (আ.)-এর মনোনয়নের পরে সংঘটিত হয়েছিল, রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের কিছুদিন আগে, যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। রাসুল (সা.) সাহাবীদেরকে আদেশ করলেন: "তোমরা কাগজ ও কলম নিয়ে আসো, আমি তোমাদেরকে এমন কিছু লিখে দেব, যাতে এর পরে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।" তখন উমার বিন খাত্তাব বাধা দিয়ে বললেন, "রাসুল (সা.) মৃত্যুযন্ত্রণায় প্রলাপ বকছেন। তাছাড়া আমাদের মাঝে তো কুরআন আছেই। কিতাবুল্লাহ-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট।" এতে রাসুল (সা.) রাগান্বিত হলেন এবং সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন।

উল্লেখ্য, এর কিছুদিন আগে গাদীরে খুম-এ রাসুল (সা.) যখন হযরত আলী (আ.)-কে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা (তথা মাওলা) হিসেবে মনোনীত করেন, ঠিক তার পরপরই কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছিল:
"...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম..." (সূরা মায়েদা, ৫:৩)
অর্থাৎ, "পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, তা নির্ধারণ করে দেবেন বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা" -- এই বিধানটা ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হবার মাধ্যমে ইসলামের গতিশীলতা নিশ্চিত হলো, ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করলো। রাসুল (সা.)-ও নিশ্চিন্ত হলেন, কেননা সোয়া লক্ষ সাহাবীর সামনে তিনি পরবর্তী নেতা নির্বাচিত করে দিয়েছেন। অতএব, তাঁর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহ আলী (আ.)-এর নেতৃত্বে ভালো থাকবে।

প্রশ্ন: তাহলে, ইসলামকে আল্লাহ যখন পূর্ণাঙ্গ করেই দিয়েছেন গাদীরে খুমে, তারপর আবার কাগজ-কলমে কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তাটা কী ছিল? তাও আবার রাসুল (সা.) বললেন যে, সেই লিখিত উইল মুসলিম উম্মাহকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাবে! এত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি রাসুল (সা.) করার আগেই কেন আল্লাহ তায়ালা দ্বীনে পূর্ণাঙ্গ করে দিলেন? দুটো তো মিলছে না!

উত্তর: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) বাহুল্য কথা ও কর্ম থেকে মুক্ত। এমতাবস্থায় যখন রাসুল (সা.) বললেন যে, কাগজে তিনি কিছু লিখে দিলে এরপর মুসলিম উম্মাহ পথভ্রষ্ট হবে না -- তার মানে তিনি নিশ্চয়ই মুসলিম উম্মাহর পথভ্রষ্ট হবার আশঙ্কা করেছিলেন। আর এই আশঙ্কাটা গাদীরে খুমের আগেই যদি করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই কাগজ-কলমের ঘটনাটা গাদীরে খুমের আগেই ঘটত! তখন ব্যাপারটা এমন হতো: "আলীকে মাওলা মনোনীতও করলাম, কাগজে একটা জিনিস লিখেও দিলাম, ব্যস, এরপর উম্মাহ আর পথভ্রষ্ট হবে না, এখন আল্লাহ তায়ালা দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করার আয়াত নাযিল করবেন...।"

অতএব, এটা নিশ্চিত যে, গাদীরে খুমে হযরত আলী (আ.)-কে মাওলা মনোনীত করার পর রাসুল (সা.) নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু সেটা বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। নিশ্চয়ই এর পরে মুসলমানরা (সাহাবীরা) এমন কোনো আচরণ করেছিলেন বা তাদের কাজকর্মে এমন কিছুর আঁচ রাসুল (সা.) পেয়েছিলেন, যাতে পথভ্রষ্টতার আশঙ্কা নতুন করে তৈরী হয়েছিল। আর সেটা কী ছিল? সেটা জানতে হলে আরেকটি ইতিহাস একটু দেখতে হবে।

৩. হাদীসে সাকালাইন: গাদীরে খুমের সেই ভাষণে রাসুল (সা.) আরো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন: "আমি তোমাদের মাঝে দুটি ওজনদার বস্তু রেখে যাচ্ছি, যতদিন এই দুটিকে তোমরা আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না: এক, আল্লাহর কিতাব কুরআন, দুই. আমার রক্তসম্পর্কের আহলে বাইত। কেয়ামত পর্যন্ত এই দুটি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। আমি আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহর কথা (অর্থাৎ আহলে বাইতের নিষ্পাপত্বের আয়াত ৩৩:৩৩-এর কথা) স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।" শেষের কথাটি তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন। একই ভাষণে তিনি হযরত আলী (আ.)-কে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা তথা 'মাওলা' মনোনীত করলেন, তাঁর প্রশংসাও করলেন।

সার্বিকভাবে এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের পর মুসলমানদের সার্বিক নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব থাকবে রাসুল (সা.)-এর বংশের হাতে; আলী (আ.) প্রথমে, এবং তারপর আলী (আ.)-এর বংশ থেকে। অথচ আরবের প্রায় সকলেই মুসলমান হয়েছে বটে, কিন্তু গোত্রীয় অংঙ্কার তাদের মধ্য থেকে তখনও দূর হয়নি। "আমরা সবাই এত যুদ্ধ করলাম ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য, এত পরিশ্রম করলাম, অথচ নেতৃত্ব, শাসন-কর্তৃত্ব নবীর গোত্রের মধ্যে সীমিত হয়ে থাকবে, তাও আবার বিশেষভাবে তার পরিবারের হাতে, উপরন্তু তারা আবার গণীমতের মাল ও সরকারী ট্যাক্স থেকে সবসময় নির্দিষ্ট অংশ পাবে, সেটা তারা যুদ্ধ করুক বা না করুক... এটা তো মেনে নেয়া যায় না!" (দেখুন এখানে: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1323927477730720)

এই অনুভূতিই তখন অন্য গোত্রের অনেকের মাঝে বিরাজ করছিলো। যেটা তারা আচরণে ও কথা-কর্মে প্রকাশ করেছিলেন। এমতাবস্থায় উম্মাহর ঐক্য ধরে রাখতে রাসুল (সা.) 'কিছু একটা' লিখে দিতে চাইছিলেন।
সেই 'কিছু একটা' কী হতে পারে?

নিশ্চয়ই সেটা হলো এই যে: "তোমরা অবশ্যই কুরআন ও আহলে বাইতকে অনুসরণ করবে, এবং আমার পরপর অবশ্যই আলীকে রাষ্ট্রসহ সকল বিষয়ের নেতা তথা মাওলা হিসেবে গ্রহণ করবে।"

কিন্তু সাহাবীদের (একাংশের) মাঝে গোত্রীয় অহঙ্কার তখন অন্য ধারায় প্রবাহিত হচ্ছিলো, যা আগে কথা-কর্মে নানাভাবে প্রকাশ পেলেও চুড়ান্তভাবে প্রকাশ পেল উমার বিন খাত্তাবের কথায়: যখন রাসুল (সা.) মৃত্যুশয্যায় কাগজ-কলম এনে বিষয়টিকে মৌখিকের পাশাপাশি লিখিত রূপ দান করতে চাইলেন, তখন উমার বাধা দিয়ে বললেন: "আমাদের জন্য কুরআনই যথেষ্ট।" অর্থাৎ, রাসুল (সা.) যে "কুরআন ও আহলে বাইত" একত্রে আঁকড়ে ধরতে বলেছিলেন, সেটার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ করলেন। এবং রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পরপরই তিনি আবু বকরকে 'খলিফা' বানানোর কর্ম সম্পাদন করলেন। রাসুল (সা.)-এর আশঙ্কাই সত্য হলো। উম্মাহ পরিত্যাগ করলো আহলে বাইতকে। শিয়া-সুন্নি দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়লো। দয়াল নবীজিকে (সা.) আমরা সকলে মিলে কিভাবে এতটা ব্যথা দিতে পারলাম! :'(

(বাকী অংশ পরের পর্বে...)


#আমাদের_রাজনীতি - ৯

পোস্ট আর্কাইভ: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1710725335717597

তো, রাসুল (সা.) একটা কিছু লিখতে ইচ্ছা করলেন, কিন্তু 'সাহাবীদের' একাংশ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হলেন। তখন তিনি মৃত্যুশয্যায়। আমরা গতপর্বের আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট বুঝেছি যে, কুরআন ও আহলে বাইতের অনুসরণ ও আলী (আ.)-কে মাওলা (তথা রাষ্ট্রপ্রধানসহ সকল বিষয়ের সর্বোচ্চ নেতা) হিসেবে গ্রহণ করার কথাই খুব সম্ভবতঃ তিনি লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই বৃহস্পতিবারের পরেও তো তিনি আরো কিছুদিন বেঁচে ছিলেন। তখন কেন তিনি পুনরায় সেটা লেখানোর উদ্যোগ নিলেন না? যদি সেটা এতই গুরুত্বপূর্ণ হবে যে, মুসলিম উম্মাহকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করলে আমরা রাসুল (সা.)-এর প্রজ্ঞা (wisdom, হিকমাহ) শিখতে পারি। আসুন সেই উত্তরটি সন্ধান করি।

প্রথমেই বিবেচনা করি, পরবর্তীতে তিনি আবার লেখানোর উদ্যোগ নিলেন না, তারমানে হয়ত বিষয়টা অতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
কিন্তু এই সম্ভাবনাটি আমরা গ্রহণ করতে পারছি না একারণে যে, তাহলে রাসুল (সা.)-এর উক্ত বক্তব্যকে আমরা প্রলাপ সাব্যস্ত করে বসব, যা নবুওয়্যাতের সংজ্ঞার বিরোধী। একজন নবীকে আপনি দৈহিকভাবে টর্চার করে মেরে পর্যন্ত ফেলতে পারবেন, কিন্তু তার মুখ দিয়ে ভুল কথা উচ্চারণ করাতে পারবেন না -- স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা সেটা রক্ষা করবেন, কেননা, তা না হলে নবুওয়্যাতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ (purpose defeated) হয়ে যায়। আর কুরআনেও আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে, রাসুল (সা.) নিজের প্রবৃত্তি থেকে কিছু বলেন না, তিনি পাগল নন, প্রলাপ বকা তাঁর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, ইত্যাদি। অতএব, রাসুল (সা.) সজ্ঞানেই বলেছিলেন যে, "আমি তোমাদেরকে এমন কিছু লিখে দেব, যাতে এর পরে তোমরা আর পথভ্রষ্ট হবে না।"

তাহলে দ্বিতীয় আরেকটি উত্তর হতে পারে, তা হলো, ঐ ঘটনার পরপরই আবার এমন কিছু ঘটেছিল, যাতে উম্মাহর পথভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দূর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এমন কোনো ইতিহাস আমরা পাই না। রাসুল (সা.) কুরআন ও আহলে বাইতের অনুসরণ ও আলী (আ.)-এর মাওলাইয়াতকে লিখিত রূপ দিতে চেয়েছিলেন (সম্ভবতঃ)। কারণ গাদীরে খুমে হযরত আলী (আ.)-কে মৌখিকভাবে মাওলা ঘোষণা এবং কুরআন ও আহলে বাইতের অনুসরণের মৌখিক আদেশের পরে (সম্ভবতঃ) রাসুল (সা.) সাহাবীদের (একাংশের অথবা প্রভাবশালীদের) মাঝে এর বিপরীত আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন। তাই তিনি উম্মাহকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে আদেশটি লিপিবদ্ধ করাতে চেয়েছিলেন। আর যেদিন লিপিবদ্ধ করাতে চাইলেন, সেদিন উম্মাহর দাপুটে এক ব্যক্তি, উমার বিন খাত্তাব সেই আদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ করলেন: "কাগজ-কলমের দরকার নেই, আমাদের জন্য কিতাবুল্লাহই যথেষ্ট।" অর্থাৎ, মুহাম্মদ (সা.) তো মৃত্যুশয্যায়, আর ক'দিন পর ইন্তেকাল করবেন, যদিও তিনি কুরআন ও আহলে বাইতের অনুসরণ করতে বলেছেন, এবং আলী (আ.)-কে মাওলা ঘোষণা করেছেন, তবুও আমরা না অনুসরণ করব আহলে বাইতকে, আর না মানব আলীকে মাওলা, বরং আমরা শুধু কুরআন ব্যবহার করব (এবং নিজেরা ক্ষমতা দখল করব)। এটাই ছিল রাসুল (সা.) এর বিপরীতে দাঁড়ানোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। অতএব, রাসুল (সা.) তাঁর উম্মাহর ব্যাপারে (আহলে বাইত ও আলীকে অমান্য করার) যে আশঙ্কা করেছিলেন, তা দূর তো হলোই না, বরং আরো পাকাপোক্ত হলো। আর ক'দিন পর রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করলে সেই ব্যক্তিরা দাফন-কাফন ছেড়ে দূরে গিয়ে ক্ষমতা দখলের কর্ম সম্পাদন করলেন। অতএব, "উম্মাহর পথভ্রষ্ট হওয়া যে আশঙ্কা রাসুল (সা.) করেছিলেন, তা ঐ বৃহস্পতিবারের পরে দূর হয়ে গিয়েছিল, তাই তিনি আর কাগজে লিখিয়ে যাননি" -- এই সম্ভাবনাও নাকচ হয়ে যাচ্ছে।

তৃতীয় উত্তরটি তাহলে কী?
এখানে আমরা একটি সম্ভাবনার কথাই ভাবতে পারি, আর তা হলো: উম্মাহকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে বাঁচানোর প্রজ্ঞা। কেননা, উম্মাহর দাপুটে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাঝে আহলে বাইতকে, বিশেষভাবে আলী (আ.)-কে ভবিষ্যতে মেনে না নেবার যে প্রবণতা তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, এমতাবস্থায় যদি তিনি কাগজে আলী(আ.)-কে মাওলা ঘোষণা করে দিয়ে যেতেন, লিখে দিয়ে যেতেন "কুরআন ও আহলে বাইতের" অনুসরণের আদেশ, তাহলে হয়ত এই ব্যক্তিরা প্রকাশ্যেই নবীর বিরোধিতা করে অমুসলিম হয়ে যেত, এবং বলত যে, মুহাম্মদ তার নিজের গোত্র ও পরিবারকে ক্ষমতা-টাকা-পয়সা সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছে।
আর তখনও আরব মুসলমানদের মধ্য থেকে গোত্রীয় অহংকার দূর হয়নি। সেইটাকে কাজে লাগিয়ে উম্মাহর এই দাপুটে প্রভাবশালী লোকেরা বহু লোককে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। (তারা যে উম্মাহর বহু লোককে একটা মতের সপক্ষে জড়ো করতে সক্ষম ছিল, সেটা আমরা খিলাফতের ইতিহাসে দেখি: উমার কর্তৃক আবু বকরকে খলিফা বানানো এবং পরবর্তীতে সবার সম্মতি আদায় এবং তাকে খলিফা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ছাড়া।)

এখন আমরা তাকাই মাওলা আলী (আ.)-এর দিকে। তাঁর চাচাতো ভাই ও প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) গোটা জীবনটা ব্যয় করলেন এই উম্মাহর কল্যাণের জন্য। উম্মাহর কল্যাণের জন্যই আলীকে (আ.) পরবর্তী মাওলা হিসেবে মনোনীত করে গেলেন। আদেশ করলেন কুরআন ও আহলে বাইতকে অনুসরণ করতে, যেই আহলে বাইতের সদস্য আলী (আ.) নিজেও। সেই উম্মাহর দাপুটে প্রভাবশালী লোকেরা নবীজির (সা.) বিরোধিতা করলো: আহলে বাইত ও আলীকে পরিত্যাগ করে "শুধু কুরআন" অনুসরণের ঘোষণা দিয়ে দিল। রাসুল (সা.) যদি কাগজে কলমে লিখিয়ে দিয়ে যেতেন, তাহলে হয়ত তারা কুরআনটাকেই পরিত্যাগ করত, তবুও ক্ষমতার লোভ ও গোত্রীয় দ্বন্দ্ব ছাড়ত না।

এখন দেখুন, তাদের দিক থেকে এটি ক্ষমতার লোভ ও গোত্রীয় দ্বন্দ্ব: কেন মুহাম্মদের গোত্রই ক্ষমতায় থাকবে। অপরদিকে রাসুল (সা.) ও আলী (আ.)-এর দিক থেকে এটি প্রেম, ভালোবাসা, দয়া ও খোদাপ্রদত্ত দায়িত্ব: মানবজাতির কল্যাণার্থে 'মাওলার' কঠিন দায়িত্ব পালন করা। (ক্ষমতার লোভ কিংবা নিজের গোত্র/পরিবারকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানোর মত নিকৃষ্ট মানসিকতা নয়।)
এই লোকেরা স্বয়ং রাসুল (সা.) এর বিরোধিতা করেছে এমন পর্যায় পর্যন্ত যে, আরেকটু হলে তারা কুরআন পর্যন্ত ছেড়ে দেবে -- আর এমতাবস্থায় হযরত আলী (আ.) কি নিজের 'মাওলাইয়াত' দাবী করবেন? যেখানে তারা নবীর আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে, নবীর দাফন-কাফনের আগেই নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে একজনকে 'খলিফা' ঘোষণা করে নিয়েছে?
এমতাবস্থায় আলী (আ.) যদি বলতেন যে, তোমাদের এই কর্ম সঠিক নয়, আমিও তোমাদের মাওলা -- তাহলে তারা আলী (আ.)-কে অবশ্যই ক্ষমতালোভী সাব্যস্ত করতো, আর এর মাধ্যমে তারা জাহান্নামের আগুন তাদের জন্য অবধারিত করতে ফেলত। আর উম্মাহর কল্যাণ করা যার দায়িত্ব, সেই আলী (আ.) অবশ্যই এমন কর্ম থেকে বিরত থাকবেন, যা উম্মাহকে আরো পথভ্রষ্টতায় নিয়ে যায়। রাসুল (সা.)-ও একই প্রজ্ঞা থেকে উমার কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হবার পর দ্বিতীয়বার কাগজ-কলমে লিখানোর উদ্যোগ নেননি আর। কেবলমাত্র ভালোবাসা থেকেই, উম্মাহকে আরো পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্যেই।

হযরত আলী (আ.)-এর দীর্ঘ ২৫ বছরের নীরবতাটা ছিল চোখে কাঁটা বিঁধার মত, অথচ উম্মাহর কল্যাণার্থে তিনি নীরবে সয়ে গেছেন, উপরন্তু প্রথম তিন খলিফাকে যথাসম্ভব সহায়তা করেছেন কুরআন-সুন্নাহ মেনে চলার ক্ষেত্রে: উম্মাহর কল্যাণ করা যে তাঁর দায়িত্ব!
যারা আলী (আ.) এর এই অবস্থানটা বোঝে না, তারা এই যুক্তি দেয় যে: "তাহলে আলী কেন নিজের ক্ষমতা দাবী করলেন না, কেন তিনি উল্টা প্রথম তিন খলিফার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেন ও তাদের সাথে সহায়তা করলেন?"
তারা তো 'মাওলা' আলীর এই দায়িত্ব, প্রজ্ঞা, ব্যথা ও ভালোবাসার দৃষ্টিকোণ জানে না!

তবে আমাদের সেই প্রশ্নটা কিন্তু রয়েই গেল: রাসুল (সা.) কেন লিখিত সংবিধান দিয়ে গেলেন না? রাষ্ট্র যে একটি progressive জিনিস, এবং এজন্যেই কিছু মূলনীতি ছাড়া যে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় সংবিধান দেয়া যায় না, তা নিয়ে পরের পর্বে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

#আমাদের_রাজনীতি - ১০

পোস্ট আর্কাইভ: https://www.facebook.com/masud.alam.nure/posts/1710725335717597

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

টাকার ইতিহাস, মানি মেকানিজম ও ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের মহা জুলুম

ভূমিকা: জালিমের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম
 (মহররম: ইনফো সিরিজ এর শেষ পোস্ট ছিল এটা। মূল সিরিজটি পড়ে আসুন)
জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাস হলো মহররম মাস। জালিমের মুখোশ উন্মোচনের মাস মহররম। জুলুমের কূটকৌশল উন্মোচনের মাস মহররম। আধুনিক সেকুলার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় লেজিসলেশান (সংসদ), আর্মড ফোর্সেস (আর্মি) ও জুডিশিয়ারি (আদালত) হলো এক মহা জুলুমের ছদ্মবেশী তিন যন্ত্র, যারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে জুলুম টিকিয়ে রাখার জন্য। তারচেয়েও বড় জালিম হলো big corporations: বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, যারা তাবৎ দুনিয়াকে দাস বানিয়ে রেখেছে। আর এই দাসত্বের শৃঙ্খলে তারা আমাদেরকে আবদ্ধ করেছে ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের মাধ্যমে: টাকা আমাদের শ্রমকে ধারণ করে, অথচ সেই টাকার মূল্য আপ-ডাউন করায় অন্যরা -- ব্যাংক ব্যবসায়ীরা! টাকা আমাদের শ্রমকে সঞ্চয় করার মাধ্যম, অথচ সেই টাকা আমরা প্রিন্ট করি না, প্রিন্ট করে (ব্যাংকের আড়ালে) কিছু ব্যবসায়ী! সেই টাকার মান কমে যাওয়া (বা বেড়ে যাওয়া) আমরা নির্ধারণ করি না -- নির্ধারণ করে ব্যাঙ্ক (ব্যবসায়ীরা)! ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রতিবাদী চেতনাকে ধারণ করব, শোকাহত হব কারবালার স্মরণে, অভিশাপ…

ধর্মব্যবসা: মুসলমানদের হাতে ইসলাম ধ্বংসের অতীত-বর্তমান (১)

ভূমিকা যদিও পলিটিকাল-রিলিজিয়াস ইস্যুতে নিশ্ছিদ্র আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করে আলোচনা করার অভ্যাস আমার, কিন্তু এখানে বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরে আর্গুমেন্ট করার প্রথমতঃ ইচ্ছা নেই, দ্বিতীয়তঃ সময় ও সুযোগ নেই। আমি যা সত্য বলে জানি, তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। যারা আমার উপর আস্থা রাখেন তাদের জন্য এই লেখাটি সোর্স অব ইনফরমেশান, উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষদের জন্য সত্য অনুসন্ধানের নতুন কিছু টপিক, আর প্রেজুডিসড ধর্মান্ধ রোগগ্রস্ত অন্তরের জন্য রোগ বৃদ্ধির উছিলা। শেষ পর্যন্ত আর্গুমেন্ট ও ডায়লগের দুয়ার উন্মুক্ত রাখার পক্ষপাতী আমি, কিন্তু সেই আর্গুমেন্ট অবশ্যই সত্য উন্মোচনের নিয়তে হওয়া উচিত, নিজের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস ও ধ্যান ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করবার উদ্দেশ্যে নয়। মক্কা-মদীনা: মুহাম্মদ (সা.) থেকে আলে-সৌদ (৬২৯-১৯২৪) এদেশের অধিকাংশ মানুষ মক্কা-মদীনার ইতিহাস কেবল এতটুকু জানেন যে, মুহাম্মদ (সা.) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন। কিন্তু প্রায় চৌদ্দশ’ বছর আগে মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র থেকে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরবের ইতিহাস কম মানুষই জানেন। পবিত্র ম…

পিস টিভি, জাকির নায়েক ও এজিদ প্রসঙ্গ

সম্প্রতি গুলশান হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। আমি তখন দিল্লীতে ছিলাম। দেশে ফিরে শুনি পিস টিভি ব্যান করা হয়েছে বাংলাদেশে, এবং তার আগে ইন্ডিয়াতে।

আমার বাসায় টিভি নেই, এবং আমি জাকির নায়েকের লেকচার শুনিও না। কিংবা পিস টিভিতে যারা লেকচার দেন, বাংলা কিংবা ইংলিশ -- কোনোটাই শুনি না; প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া আমার ইসলামের বুঝ জাকির নায়েকসহ পিস টিভি ও তার বক্তাদেরকে ইন জেনারেল আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। Peace TV বন্ধ হওয়ায় এদেশে বিকৃত ইসলাম প্রসারের গতি কমলো -- এটাই আমার মনে হয়েছে।

একইসাথে আমি এটাও মনে করি যে, যেই অভিযোগ পিস টিভিকে ব্যান করা হয়েছে, তা নিছক অজুহাত। জাকির নায়েক কখনো জঙ্গীবাদকে উস্কে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। কিংবা পিস টিভির লেকচার শুনে শুনে ISIS জঙ্গীরা সন্ত্রাসী হয়েছে -- এটা নিতান্তই হাস্যকর কথা। ISIS এর ধর্মতাত্ত্বিক বেইজ সম্পর্কে মোটেও ধারণা নেই, এমন লোকের পক্ষেই কেবল ISIS এর জন্য জাকির নায়েককে দোষ দেয়া সম্ভব। একইসাথে আমি এ বিষয়েও সচেতন যে, পিস টিভি বন্ধ করা হয়েছে আমাদের সরকারের রেগুলার “ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ” হিসেবে, এই জন…