সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বর্তমান সময়ের ইসলাম সংক্রান্ত সমস্যার উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত

বর্তমান সময়ের ইসলাম সংক্রান্ত সমস্যার উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত

(প্রতিটি স্তরে) ইসলামের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং না থাকার সমস্যা

কোনো মানুষ ইসলামের যে স্তরেই অবস্থান করুক না কেনো, সেই স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকাটা জরুরি। একজন মুসলমানের এটাও সুস্পষ্ট জানা থাকা দরকার যে, ইসলামের জ্ঞানগত দিক দিয়ে ও আমলের দিক দিয়ে সে কোন স্তরে আছে। এবং অবশ্যই ধাপে ধাপে প্রতিটি স্তর কমপ্লিট করে উপরের স্তরে ওঠা উচিত। এমন যেনো না হয় যে, একজন মুসলমান অনেক নেকী অর্জনের মুস্তাহাব আমল (recommended act) সম্পর্কে জানে, এবং সে অনুযায়ী আমলও করে, অথচ অজ্ঞতাবশতঃ একটি হারাম কাজ (forbidden act) করে যাচ্ছে, কিংবা একটি ফরজ কাজ (mandatory act) ছেড়ে দিচ্ছে। যেহেতু ফরজ ও হারাম হলো মুস্তাহাব ও মাকরূহ কাজের আগের স্তর, অতএব একজন মুসলমানের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত প্রাথমিক স্তর শিক্ষা করা (জ্ঞান অর্জন ও সে অনুযায়ী আমল করা), অর্থাৎ এটা নিশ্চিত করা যে, সে সকল ফরজ কাজগুলি করছে, এবং সে কোনো হারাম কাজ করছে না। এরপর যখন সে নিশ্চিত হলো, তখন সে মুস্তাহাব (recommended act – যা করলে সওয়াব আছে, না করলে গুনাহ নেই, এমন) কাজ করার পিছনে শ্রম দিতে পারে। কিন্তু এমন যেনো না হয় যে, সে মুস্তাহাব কাজের পিছনে শ্রম দিচ্ছে, অথচ ওদিকে ফরজ কাজ করা হচ্ছে না, কিংবা কোনো হারাম কাজ করছে সে। সেক্ষেত্রে তার অবশ্যই উচিত হবে মুস্তাহাব কাজের পিছনে ব্যয়িত শ্রমকে ফরজ পালন ও হারাম বর্জন নিশ্চিত করার পিছনে ব্যয় করা। এমন যেনো না হয় যে, গভীর রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ছে, ওদিকে দিনের বেলায় মিথ্যা কথা বলছে। কিংবা মানুষকে কুরআন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝাচ্ছে, ওদিকে রাস্তায় বের হলে ভিক্ষুককে ভিক্ষা না দিয়ে উল্টা গালমন্দ করছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক।

মনে করি, গাছ যে অক্সিজেন দেয়, এটাই আমাদের জন্য সবসময় সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এখন, একটা বটগাছ সম্পর্কে একটা বাচ্চার কেমন ধারণা থাকতে পারে?
প্রাথমিক স্তরে সে জানবে যে, "এটা একটা গাছ। গাছ অক্সিজেন দেয়।" এরপর সে আরেকটু উপরের স্তরের জ্ঞান অর্জন করতে পারে। যেমন, "এটা একটা গাছ। এই গাছ দিনের বেলায় অক্সিজেন দেয়। এমন গাছও আছে, যা রাতে অক্সিজেন দেয়।" এরপর বাচ্চাটি আরেকটু উপরের স্তরের তথ্য জানতে পারে। যেমন, "গাছের বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে। এটা বটগাছ, বটগাছ অক্সিজেন দেয়। বটগাছ দিনের বেলা অক্সিজেন দেয়।" এরপর বাচ্চাটি বটগাছের বিশেষত্ব সম্পর্কে জানতে পারে।
এইভাবে করে একটা বাচ্চা গাছ সম্পর্কে ধাপে ধাপে উপরের স্তরের জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
এখন, একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী অবশ্যই গাছের পাতা, ছাল-বাকল, শিকড়, ফুল, ফল ইত্যাদি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানী গাছ সম্পর্কে জ্ঞানের উচ্চস্তরে অবস্থান করছেন, এবং বাচ্চাটি প্রাথমিক স্তরে অবস্থান করছে। এখন বাচ্চাটিকে যদি উভয় স্তরের অসমাপ্ত জ্ঞান দেওয়া হয়, তাহলে কেমন হতে পারে? বটগাছটি সম্পর্কে বাচ্চাটির জ্ঞান তখন এরকম হতে পারে : এটা বটগাছ। এর শিকড় মাটির খুব গভীরে প্রবেশ করে। বটগাছের বিস্তৃতি বেশি হওয়ায় আমাদেরকে যথেষ্ট ছায়া দেয়।” ব্যস, এটুকুই। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, গাছ যে অক্সিজেন দেয়, তা সে জানে না। এদিকে আবার উচ্চস্তরের জ্ঞানও তার আছে : বটগাছের শিকড় মাটির খুব গভীরে প্রবেশ করে। এখন ঐ বাচ্চাটি খুব সমস্যাজনক অবস্থায় আছে। তাকে যদি বলা হয় যে, বটগাছ অক্সিজেন দেয়, এজন্যই আমাদের বটগাছ লাগানো উচিত. তখন সে বলবে, "না, বটগাছ আমাদেরকে ছায়া দেয়, রোদ থেকে রক্ষা পেতেই আমাদের বটগাছ লাগানো উচিত,” ইত্যাদি...। তাকে এটা বুঝানো কঠিন হবে যে, তোমার প্রাথমিক স্তর শিক্ষা করা সম্পূর্ণ হয়নি, প্রাথমিক স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং তোমার নেই। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহুর্তে অক্সিজেন প্রয়োজন হয়, আর গাছ সেটা সরবরাহ করে, একারণে গাছ যে অক্সিজেন দেয়, এটা আমাদের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বটগাছ ছায়াও দেয় বটে, কিন্তু সেটা কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আমাদের খাদ্যসহ অন্যান্য চাহিদাও গাছ মেটায়, কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্ব গাছের একারণেই যে, অক্সিজেন ছাড়া আমরা এক মুহুর্তও বাঁচি না। এই কথাটা জানা না থাকলে উচ্চস্তরের জ্ঞান চর্চা করতে করতে হঠাতই বাচ্চাটার মনে হতে পারে : এইসব গাছ নিয়ে পড়াশুনার কোনো মানে নেই, এগুলি অনর্থক কাজ।

ইসলামের ব্যাপারটাও ঠিক তেমন। এজন্যে কোনো ব্যক্তি ইসলামের যে স্তরেই থাকুক না কেনো, প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে সেই স্তর পর্যন্ত সকল স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং তার থাকা দরকার। এরকম কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং না থাকা মুসলমানেরা দুনিয়ার বুকে জেনে-না জেনে বহু সমস্যা তৈরী করে যাচ্ছে।
কেউবা সর্বদা সহিংস-সশস্ত্র, কেউবা আবার সদা অহিংসা পরম ধর্ম নীতিতে চলছে, কেউবা আবার খোদাপ্রেমের নামে ত্যাগ করেছে দুনিয়াবী কর্মকাণ্ড, কেউ আবার দুনিয়াবী বিষয়ে মত্ত হয়ে পড়ে তার পক্ষে রেফারেন্স বের করে আত্মপ্রবঞ্চনা করছে। অথচ প্রত্যেকের ধর্মচিন্তাই যদি প্রাথমিক স্তর তথা ধর্মতত্ত্বের মৌলিক বিষয় থেকে শুরু করে কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিংসহ ধাপে ধাপে উপরের দিকে অগ্রসর হতো, তাহলে কোনোই বিবাদ-বিরোধ থাকতো না। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইসলাম নিয়ে যারা অন্ততঃ চিন্তা করে, তাদের মাঝেও এই আগ্রহ দেখা যায় না যে, প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিংসহ ধাপে ধাপে অগ্রসর হবে! এমনকি সে জানেও না যে, সে কোন স্তরে রয়েছে! যদি কোনো স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং তার থাকতো, তখনই সে বুঝতে পারতো যে, হ্যাঁ, আমি এই স্তরে আছি। কিন্তু তার তো কোনো স্তরেরই কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং নেই। এমতাবস্থায় অথৈ সমুদ্রে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যহীন দিকহারা নাবিকের মত অনুভুতি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

ইসলামের প্রাথমিক মৌলিক বিষয় থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা – এই কাজটি তাদের পক্ষে করা খুবই কঠিন হয়ে যায়, যারা বিভিন্ন উচ্চস্তরের কিছু কিছু জ্ঞান অর্জন করেছে, অথচ কোনো স্তরেরই পূর্ণ জ্ঞান নেই। একজন যখন ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে এবং সে বিষয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য রাখছে, তখন যদি সে না জানে যে আল্লাহ কী, কুরআনই বা কী, নবী কী, ইত্যাদি, এবং তাকে যদি আগে সেই জ্ঞান অর্জনের কথা বলা হয়, তখন সে অপমানিত-ই বোধ করবে। অথচ স্রষ্টাভাবনা, সৃষ্টিতত্ত্ব, ঐশী কিতাব ও নবীর অপরিহার্য গুণাবলী ইত্যাদি তো ইসলামের নিতান্তই প্রাথমিক স্তরের বিষয়। তাওহীদ-আখিরাত-রিসালাত ইসলামের প্রাথমিক স্তরের বিষয়। যে ব্যক্তি ইসলামী অর্থনীতি কিংবা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত, তার যেনো এমন না হয় যে, তাওহীদ-আখিরাত-রিসালাতের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং নেই। ঈমানে মুফাসসাল শেখা মানেই তাওহীদ-আখিরাত-রিসালাত ইত্যাদির জ্ঞান নয়, বরং সেটা শিরোনাম। কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভিন্ন জিনিস।
স্কুলের যে বাচ্চা ইংরেজিতে ফেইল করা সত্ত্বেও প্রতিবার উপরের ক্লাসে উঠেছে, এবং এভাবে সব ক্লাস পার করেছে, সে উপরের লেভেলের অনেক শব্দ জানে বটে, কিন্তু একটা সাধারণ বাক্যও তৈরী করতে পারে না। সে অনেক কঠিন কঠিন verb, adjective, adverb জানে, কিন্তু কোনটা কোথায় বসবে, তা সে জানে না, word order জানে না, আর তাই অর্থপূর্ণ বাক্যও আর তৈরী করতে পারে না। এ ধরণের অসম্পূর্ণ জ্ঞান ক্ষতিই বয়ে আনে।

ইসলামী জ্ঞান, ধর্মীয় জ্ঞান অথবা জ্ঞান অর্জনের স্তরবিন্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা অবকাশ এখানে নেই।


জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি নির্ধারণ না করে ধর্মীয় পড়াশুনার সমস্যা

জ্ঞান, জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি, জ্ঞানের উৎস, জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা, জ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্র ইত্যাদি হলো জ্ঞানতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের আগে, হোক সেটা ধর্মীয় বা অন্য যেকোনো জ্ঞান, জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে চিন্তা করা উচিত। আমি যখন "ইসলামী জ্ঞান" অর্জন করবো, তার আগে জানতে হবে, "জ্ঞান" অর্জনের উপায় কী কী। সেটা জানার পর "ইসলামী জ্ঞান" অর্জনের পদ্ধতি কী, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরপর যখন আমি জ্ঞান অর্জনের সঠিক পন্থা নির্ধারণ করে ফেললাম, তখন সে পদ্ধতি ব্যবহার করে আমি পরিশ্রম অনুযায়ী ফল পাবো। নয়তো দেখা যাবে যে, অনেক পরিশ্রম করার পরও আসলে কোনোই জ্ঞান অর্জন হয় নাই, কিংবা খুব সীমিত জ্ঞান অর্জন হয়েছে। ইসলামী জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে জ্ঞানতত্ত্বকে এড়িয়ে যাবার ভয়াবহতা একটু পরেই আলোচনা করছি। তার আগে একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

ইউনিভার্সিটিতে অনেক ছেলে-মেয়েকে দেখেছি, তারা পড়াশুনার পিছনে প্রচুর শ্রম দিয়ে থাকে। কিন্তু অনার্স লেভেলে পড়াশুনার মাধ্যম হলো ইংরেজি, অথচ ইংরেজিতে বেশিরভাগের অবস্থাই শোচনীয়। এমনও ছাত্র আছে যে, ১২ ক্লাস ইংরেজি পড়ে ও পাশ করে এসে ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশ করেছে, অথচ এক পৃষ্ঠা ইংরেজি লিখতে দিলে একটিও সঠিক বাক্য লিখতে পারে না। ইউনিভার্সিটি অনেক উপরের স্তর। এর আগের স্তরগুলোতেই তার ইংরেজি শিক্ষা করা দরকার ছিলো। জ্ঞান সম্পূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও সে স্তরগুলো পার করে এসেছে, এবং এখন এসে মহা সমস্যায় পড়েছে। এখন তার সমস্ত বই, পরীক্ষার খাতা, অ্যাপ্লিকেশান – সবই ইংরেজিতে করতে হচ্ছে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে কথাও ইংরেজিতে বলতে হচ্ছে। এদিকে সাফল্যের সাথে SSC-HSC পাশ করে আসা ছাত্র এটাও মেনে নিতে পারছে না যে, ইংরেজিতে সে আসলে ক্লাস ফাইভ লেভেলের যোগ্যতাও রাখে না।
এখন, কম্পিউটার এঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পদ্ধতি কী? প্রোগ্রামিঙের জ্ঞান অর্জনের নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। কিন্তু সে পদ্ধতি জানার আগে ঐ ছাত্রের জানা দরকার ভাষা শিক্ষা করার পদ্ধতি। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ইংরেজি ভাষা শেখার পদ্ধতি। এখন সে যদি এই কথাটি বুঝতে পারে তো ভালো, নয়তো সে ইংরজির জ্ঞান ছাড়া যদি প্রোগ্রামিঙের জ্ঞান অর্জনের সঠিক পদ্ধতিে পরিশ্রমও করে, তবুও সে আসলে তেমন কিছুই পারবে না। কোনো বইয়ের কোনো কথাই তার বোধগম্য হবে না। ঘন্টার পর ঘন্টা কম্পিউটার কিংবা বইয়ের সাথে যুদ্ধ করেও কাঙ্খিত ফল আসবে না। কিন্তু যদি সে এক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব বুঝতে পারে, এবং প্রথমে ইংরেজি শেখার উদ্যোগ নেয়, তাহলে সাফল্য আসতে পারে। এখন, ইংরেজি শেখার পদ্ধতি হিসেবে সে বন্ধুর পরামর্শক্রমে ইংরেজি মুভি দেখতে শুরু করলো। কিন্তু হয়তো অ্যাকশনধর্মী সেসব মুভিতে কথা বলতে আছে শুধু গালিগালাজ। অতএব, ভুল পদ্ধতিতে ইংরেজি শিক্ষা করার কারণে এখন তার অবস্থা "গালি দিয়া সব গদ্যে পদ্যে বিদ্যা করিছে জাহির”। এভাবে বহু ঘন্টা ব্যয় করেও তার জ্ঞান অর্জন ঠিকমতো হলো না, কারণ সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ করতে সে ব্যর্থ হয়েছে।

ইসলামী জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সচেতনভাবে জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি নির্ধারণ না করে ধর্মীয় জ্ঞানের মহাসমুদ্রে ডুব দিলে দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি বরণ করতে হবে। ইসলামী জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি নির্ধারণ না করে জ্ঞান অর্জনের সমস্যা কেমন হতে পারে? যেমন, নিচের আর্গুমেন্ট :
"আল্লাহ পরম জ্ঞানী; তাহলে আমি জান্নাতে যাবো না দোযখে যাবো, তা-ও কি আল্লাহ জানেন? আর আল্লাহ যদি আগে থেকেই তা জানেন, তাহলে তো সেটা আমার কপালেই লেখা আছে, আমি শত চেষ্টা করেও ভালো মানুষ হতে পারবো না, জান্নাতে যেতে পারবো না।"
কুরআনে আল্লাহকে পরম জ্ঞানী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কুরআনের তাৎপর্য গ্রহণের সঠিক পদ্ধতি, অর্থাৎ, কুরআনের জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি নির্ধারণ না করে কেউ যদি একটিমাত্র বাক্য পড়ে, যেখানে আল্লাহকে পরম জ্ঞানী বলা হয়েছে, তারপর মনে মনে উপরের আর্গুমেন্ট করে, তাহলে সে নিশ্চিত ভুলের মধ্যে পড়লো। এবং এই ভুল একজন দুইজন না, অসংখ্য মানুষ করেছে, করে আসছে, এবং কোটি কোটি মুসলমানকে শিক্ষা দিয়ে আসছে যে, “ভাগ্যের লিখন, না যায় খণ্ডন”, "ভাগ্যেই সবকিছু লেখা থাকে”, ইত্যাদি। অথচ এগুলো সুস্পষ্টরূপে ভ্রান্ত ধারণা। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে হতাশাবাদেরও সূত্রপাত হয়।

একইভাবে, কুরআনের তাৎপর্য গ্রহণের সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ না করে কুরআনের এই কথাটা যদি কেউ পড়ে : "মানুষ তা-ই পায়, যা সে করে"; এবং তারপর ধারণা করে যে, "আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার প্রয়োজন নেই, বরং মানুষ কর্ম করলেই ফল পাবে”, তখন সে নিশ্চিতভাবেই ভুলের মধ্যে পড়লো। এরকম ভ্রান্ত ধারণা মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করার পর একটি গ্রুপ সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিলেও প্রার্থনা, দোয়া-দরুদ ইত্যাদির গুরুত্বকে খাটো করে দেখছে ও দেখানোর চেষ্টা করছে।

জিহাদ (প্রচেষ্টা), কিতাল (হত্যা), রাষ্ট্র, শুরা (পরামর্শ), হালাল, হারাম, আল্লাহর রজ্জু, উলিল-আমর ইত্যাদি অসংখ্য বিষয়ে বহু পরস্পরবিরোধী মতের উদ্ভব ঘটেছে সঠিক পদ্ধতিতে কুরআনের তাৎপর্য গ্রহণ না করার ফলে। অথচ কুরআনের জ্ঞান গ্রহণের আগে ঐশী কিতাবের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, এবং তারও পূর্বে স্রষ্টার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, নবী চেনার উপায়, আখিরাত ইত্যাদি প্রসঙ্গে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। নয়তো কেউ ঐশী কিতাবকে পরিবর্তনযোগ্য মনে করে যতই কুরআন পড়ুক, নিশ্চিন্ত হয়ে আস্থা রাখতে পারবে না কখনোই। কেউ যদি আল্লাহর শরীর আছে বলে ধারণা করে, তাহলে "আল্লাহর রজ্জু”কে সে বস্তুগত জিনিস বলে মনে করতেই পারে।

কেউ যদি প্রতিদিন মানুষের লেখা ধর্মীয় বই পড়ে, এভাবে সারা জীবনে অসংখ্য মানব-রচিত ধর্মীয় বই পড়ে, অথচ আল্লাহর কিতাব, কুরআন না পড়ে, তবে তার সারাজীবনের শ্রম প্রায় পুরোটাই বৃথা। অথচ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করলে সে প্রথমেই ঐশী কিতাবের সন্ধান করতো, এবং কুরআন পাঠে মনোযোগী হতো। হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতি না জেনে "সহীহ হাদীস" বলে প্রচারিত যেকোনো কথাকেই যদি কেউ বিশ্বাস করে, তবে সে নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অপরকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সে যদি নবীর পাপমুক্ততার ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়, তাহলে মিথ্যা হাদিস সে সহজেই গ্রহণ করবে, ইত্যাদি।

যদিও জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই, তবুও আশা করি এতটুকু বুঝানো গিয়েছে যে, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার জন্য জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি, অর্থাৎ জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে আলাদাভাবে পড়াশুনা ও গবেষণা করা অপরিহার্য।

ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টারের গুরুত্ব

পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টার না থাকার ফলে একদিকে যেমন ধর্মীয় দল / মতগুলোর সংশোধন-উন্নয়ন ঘটছে না, অপরদিকে তেমনি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত মুসলমানেরা ঐক্যবদ্ধও হতে পারছে না। মুসলিম সমাজ হলো জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। এখানে গোত্র প্রথাও নেই যে বিভিন্ন গ্রুপ আলাদা আলাদা গোত্র হিসেবে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। আদর্শ মুসলিম উম্মাহ গোটা বিশ্বব্যাপী একই মূলনীতিতে চলবে, এবং তাদের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা থাকবে না। এটা নিশ্চিত করতে হলে ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টার থাকলে সেখানে নিয়মিত জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে প্রতিটি গ্রুপই যেমন নিজেদের ভুল-ত্রুটির সংশোধন করতে পারবে, অপরদিকে তেমনি সকল গ্রুপের সর্বোচ্চ জ্ঞানী ব্যক্তিরা রিসার্চ সেন্টারে একত্রিত হয়ে পরস্পর জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে ঐক্যের দিকে পৌঁছাতে পারবে। অতঃপর এই রিসার্চ সেন্টার থেকে যেসকল দিক-নির্দেশনা আসবে, মুসলিম জনগণ সেটা মেনে চলবে। রাসূলের (সা.) অনুপস্থিতিতে আলেম সমাজের কর্মকাণ্ড এভাবেই পরিচালনা করা প্রয়োজন। কিন্তু তা না করে যদি প্রতিটি গ্রুপ তাদের নিজস্ব মতবাদ / মতামত নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, পরস্পরের সাথে জ্ঞান-বিনিময় না করে, এবং নিজেদের চিন্তাধারাকে শতভাগ সঠিক বলে ধরে নিয়ে প্রচার-প্রসার করতে থাকে, তাহলে যা ঘটবে তা হলো, সময়ের সাথে সাথে গ্রুপগুলো আকারেই কেবল বাড়বে, কিন্তু তাদের ভুল-ভ্রান্তিগুলো রয়েই যাবে, এবং বিভিন্ন গ্রুপের মাঝে দ্বন্দ্ব-সংঘাতেরও নিরসন কখনো হবে না।

মুসলিম মিল্লাত কিভাবে ঐক্যবদ্ধ হবে, যখন তাদের নেতারা (আলেম সমাজ) ঐক্যবদ্ধ নন? আর আলেম সমাজের এই ঐক্য হতে হবে জ্ঞানগত ঐক্য। সেজন্যে একটি মুসলিম ভুখণ্ডের সকল আলেমকে এক প্ল্যাটফর্মে আসতে হবে। একই প্ল্যাটফর্মে এসে পরস্পর জ্ঞান-বিনিময় করতে হবে। অতঃপর নিজেদের ভুলগুলো সংস্কার করতে হবে, সংশোধন-উন্নয়ন করতে হবে। আর এটাকেই আমি বলছি "কমপ্লিট রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টার"। এধরণের রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টারই হবে সকল ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের উৎস। ধর্মীয় নেতৃত্বও এখান থেকেই আসতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের মুসলিম সমাজে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড করার উপরই জোর দেয়া হয় বেশি। অথচ ইলম (knowledge) বিহীন আমল (practice) কোনোই গুরুত্ব বহন করে না। আর ইলম ছাড়া যারা আমল করতে যায়, স্বাভাবিকভাবেই তারা ভুল আমল করবে। যদি এমন হতো যে, প্রতিটা ইসলামী দল / মতেরই নেতৃত্ব একটি রিসার্চ সেন্টারে নিয়মিত একত্রিত হন, তাহলে আমরা কারো মাঝে ভুল দেখলে সেটা ঐখানে গিয়ে পেশ করতে পারতাম। কিন্তু ইসলামের নামে তৈরী হওয়া বিভিন্ন দল / গ্রুপগুলোর নেতারা নিজেদের অনুসারীদের কাছ থেকেই এজাতীয় কথা গ্রহণ করে না, আর অন্য গ্রুপের কাছ থেকে নিজের ভুল শোনার তো প্রশ্নই আসে না। অতএব, সংশোধন ও ঐক্য আসবে কিভাবে? প্রতিটা গ্রুপই নিজেদের কলেবর বৃদ্ধির প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত, অথচ ঐক্যের দিকে কারোরই নজর নেই। মুসলিম সমাজের এই জ্ঞানগত ঐক্যের জন্য জ্ঞানকেন্দ্র, অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টার অপরিহার্য।

এখন, ইসলাম নিয়ে জ্ঞান অর্জনের পূর্বশর্ত যে জ্ঞানতত্ত্বের (Epistemology) পড়াশুনা, তা আলেমসমাজকে কিভাবে বুঝানো সম্ভব? "আলেমসমাজ" বলেইতো আসলে কিছু নেই। কোনো ইস্যুতে "আলেমসমাজের কাছে গিয়েছিলাম" কথাটাই বলা সম্ভব নয়, বরং বলা যেতে পারে যে, ওমুক হুজুর আর ঐ হুজুরের শত্রুর কাছে গিয়েছিলাম ইস্যুটা নিয়ে। আমাদের বাস্তবতাটা এতই করুণ! মুসলিম সমাজে যদি কোনো পাপ কাজের প্রচলন দেখি, তবে সমাধানের জন্য কার কাছে যাবো? আলেমসমাজ বলে তো কোনো ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মই নেই! অতএব, যারা ইসলাম নিয়ে স্বাধীন জ্ঞানচর্চা করছে ও বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করছে, তারা অসহায়ের মত আশেপাশের দুয়েকজন মানুষকে বিচ্ছিন্নভাবে সতর্ক-সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, গোড়ায় গিয়ে যে সমাধান করবে, সেই গোড়ায় (আলেমসমাজের কাছে) যেতে পারছে না। আর বিভিন্ন নেতৃত্বের কাছে গেলেও, রিসার্চারের ন্যায় মনোভাব না থাকায় তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে কিংবা অন্য কোনো চিন্তা সম্পর্কে স্টাডি করতেও রাজী হন না।

ইসলামের নামে সমাজে নানান ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড চলছে। এগুলো নেতাবিহীন নয়; অবশ্যই ইসলামের নামে এসব কর্মকাণ্ড বিভিন্ন নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ইসলামবিরোধী এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হলে ও সঠিক ইসলামের প্রচার করতে হলে সেইসব ধর্মীয় নেতৃত্বের সংশোধন প্রয়োজন। সেই নেতাদের সংশোধনের জন্য, সকল ধর্মীয় নেতৃত্বকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার জন্য, ঐক্য সৃষ্টির জন্য ও সংস্কার-উন্নয়নের জন্য কমপ্লিট রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেখানে সকল ধর্মীয় নেতৃত্বের মতবিনিময়, জ্ঞানবিনিময় ও সাহায্য-সহযোগীতা, সংস্কার-উন্নয়ন ইত্যাদি ঘটবে। অতঃপর বিভিন্ন দেশের রিসার্চ সেন্টারগুলোর মাঝে বড় পরিসরে জ্ঞান-বিনিময় হলে বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে, এবং এইরূপ জ্ঞানগত ঐক্যের মাধ্যমেই গোটা দুনিয়ার মুসলিম উম্মাহর একই পতাকাতলে আসা সম্ভব হবে।

রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টার না থাকার ফলে দেখা যায় যে, কোনো ব্যক্তি আজীবন ইসলামের সংকীর্ণ একটি গণ্ডিতেই জ্ঞানচর্চা চালিয়ে গিয়েছে। অথচ হয়তো সে যে ধারায় পড়াশুনা করেছে, তার ভিত্তিই ভুল ছিলো! কিংবা সে সঠিক পদ্ধতিে জ্ঞান অর্জন করে নাই। শুধু ইসলামের বিভিন্ন ধারা নয়, অন্যান্য ধর্ম, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র ইত্যাদি সকল প্রাসঙ্গিক স্টাডি টপিকের সম্পর্কে মানুষ জানতে পারবে রিসার্চ সেন্টারের কাছে এসেই। শুধু একটি ধারায় জ্ঞানচর্চার যে সমস্যা, তা রিসার্চ সেন্টার ব্যতিরেকে দূর করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের ধারার বইপত্রই পড়ে থাকে, এমনকি বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যেও অন্য ধারার বইপত্র পড়ে না। ফলস্বরূপ সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে থাকার কারণে ভুল-ভ্রান্তির সংশোধন ঘটে না, অন্যান্য ধারা থেকে সঠিক জিনিসটাও গ্রহণ করা হয়ে ওঠে না। সকল ধরণের জ্ঞানগত বাধা (barrier) অতিক্রমকারী পূর্ণাঙ্গ ধর্মতত্ত্বকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা তাই খুবই জরুরি।

দ্বীনি নেতৃত্বের ন্যুনতম যোগ্যতা

দ্বীনি নেতৃত্বের জন্য ন্যুনতম যোগ্যতার শর্ত রয়েছে। সেই শর্ত যদি পূরণ না হয়, তাহলে কোটি কোটি মুসলমানের মাঝে যতজনই নেতা সেজে বসুক না কেনো, তারা কেউ-ই প্রকৃত ইসলামী নেতৃত্ব নয়, এবং তাদের কারো আনুগত্য করাই বাধ্যতামূলক নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের বিরোধিতা করা ফরজ হয়ে পড়ে।
এখন, ইসলামের নামে পরস্পরবিরোধী প্রতিটা দল / মতেরই ধর্মীয় নেতৃত্ব আছে। একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে সত্যিকার দ্বীনি নেতৃত্বকে শনাক্ত করবে? যখন প্রতিটা গ্রুপই নিজেদেরকে সঠিক বলে দাবী করছে, তখন তাদের যেকারো আনুগত্য করার আগে যাচাই বাছাই করতে হবে। এই যাচাই-বাছাইয়ের মানদণ্ড কী? এইযে ইসলামের নামে বিভিন্ন দল / মতের অসংখ্য অনুসারী রয়েছে, এবং দিনদিন তারা কলেবরে বেড়েই চলেছে, নিশ্চয়ই তারা কোনো না কোনো মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা করছে, ঐ নেতৃত্বকে মেনে নিচ্ছে। নিশ্চয়ই তাদের মানদণ্ড এক নয়। যদি প্রতিটা মানুষই, তা সে ইসলামের যে স্তরেই থাকুক না কেনো, প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে ঐ স্তর পর্যন্ত সকল স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং নিয়ে অগ্রসর হতো, তাহলে তাদের সকলের মানদণ্ড একই হতো, এবং তারা পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় নেতৃত্বের অনুগামী না হয়ে একই ধর্মীয় নেতার আনুগত্য করতো। কিন্তু ইসলামের partial understanding নিয়ে অগ্রসর হওয়া মানুষেরা বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে নেতৃত্ব পছন্দ করে নিচ্ছে, যদিও তারা জানে না যে, সেটাই প্রকৃত মানদণ্ড কিনা। যেমন, কারো কাছে হলো সেই গ্রুপ-ই সঠিক, যারা সমাজে ইসলাম কায়েমের কথা বলে, রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েমের কথা বলে। তখন সে এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোনো দলে গিয়ে ভিড়ছে। আবার, কারো কাছে হয়তো তারাই সঠিক, যারা ব্যক্তিজীবনে ইসলাম কায়েমের কথা বলে। তখন সে ঐ গ্রুপের সাথে চলছে। কেউবা আবার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে জিহাদ কিংবা কিতালকে, অর্থাৎ যেই গ্রুপ কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও কিতালের কথা বলবে, তাদেরকেই সে অনুসরণ করবে। এইভাবে ইসলামের partial understanding নিয়ে অগ্রসর হওয়া মানুষেরা বিভিন্ন অনুপযুক্ত মানদণ্ডের ভিত্তিতে নেতৃত্ব পছন্দ করে নিচ্ছে।

ইসলামের প্রকৃত দ্বীনি নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য কী? ইলম (জ্ঞান), আদালত (ভারসাম্য) ও দূরদৃষ্টি। এই তিনটিই কি শর্ত, নাকি আরো বেশি, নাকি আরো কম? এ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, রিসার্চ প্রয়োজন। উন্মুক্ত মানসিকতা নিয়ে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। পরস্পর জ্ঞান-বিনিময়ের মাধ্যমে আলেমগণের ঐকমত্যে আসা প্রয়োজন। অতঃপর তারা নিজেরাই সে মানদণ্ড অনুযায়ী দ্বীনি নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন, এবং সকলেই সেটা মেনে নেবে।

একজন ধর্মীয় নেতা যদি এমনসব ভুল কাজ করেন, যা সাধারণ মুসলমানের দৃষ্টিতেই অন্যায়, তখন কি তিনি আর নেতৃত্বের যোগ্য থাকেন? দ্বীনি নেতৃত্বকে যদি মানুষ দেখে কথা ও কাজের মিল নেই, তিনি দুনিয়াবী লাভের পিছনে ছুটছেন, তখন তার উপর আস্থা কি আর থাকবে? আল্লাহর রাসূলের (সা.) অনুপস্থিতিতে কে বা কারা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন? ইত্যাদি বহু বিষয় রয়েছে, যা আলাদা আলোচনার টপিক।

কুরআনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা, ইসলামের সংকীর্ণ / পার্শিয়াল রেপ্রিজেন্টেশান

প্রায় প্রতিটা গ্রুপই কমবেশি এই কাজ করে থাকে। নিজেদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডকে justify করার জন্য কুরআন-হাদীস থেকে কিছু রেফারেন্স তুলে ধরে। সহিংস-সশস্ত্র গ্রুপগুলো কুরআন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু জিহাদ ও কিতাল সংক্রান্ত আয়াত উপস্থাপন করে, সেইসাথে প্রাসঙ্গিক হাদীস নিয়ে আসে। কেউবা আবার কুরআন থেকে "আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরা” ও সংঘবদ্ধ হয়ে থাকার রেফারেন্স এনে তাদের দলে টানার চেষ্টা করে। এগুলো সবই কুরআনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা, ইসলামের partial representation. সাধারণ মুসলমান যেহেতু কুরআন না পড়লেও এর উপর আস্থাশীল, তাই এই আস্থার সুযোগ নিয়ে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের ভুল / সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করে নিজেদের দল ভারী করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বিভিন্ন গ্রুপগুলো।

একই কাজ কিন্তু ইসলামবিরোধীরাও করে থাকে। যেমন, “তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা করো”, এই কথাটি, যেটা পুরো একটা আয়াতও নয়, বরং আয়াতের একটি অংশ, সেটা তুলে দিয়ে তারা বলে যে ইসলাম সন্ত্রাসের ধর্ম, ইসলাম বিধর্মীদের গণহারে হত্যা করার আদেশ দিয়েছে। সকল মুসলিম গ্রুপ-ই ইসলামবিরোধীদের এই কমন অভিযোগকে অস্বীকার করে এবং বলে যে একটি আয়াতকে সংকীর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ ইসলামী বিভিন্ন দল / মতের লোকেরা নিজেরাও একই কাজ করে যাচ্ছে, শুধু নিজেদের পক্ষের আয়াতগুলো তুলে ধরছে!
এদের বেশিরভাগই নিজেরাই জানে না, কুরআন কী জিনিস, মানব-রচিত গ্রন্থ থেকে ঐশী কিতাব কুরআনের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য কী, এবং কুরআন পড়ার উপায়-ই বা কী। কুরআন থেকে তাৎপর্য গ্রহণেরই বা উপায় কী। কুরআনের কোনো অর্থ না বুঝলে হাদীসের সহায়তা নিতে হবে, নাকি আক্বল (বিচারবুদ্ধি, reason) দ্বারা সেটা সমাধান করতে হবে (পরিশিষ্ট – ১ দ্রষ্টব্য)? ধর্মীয় বিষয়ে অথরিটির পর্যায়ক্রমই বা কী (পরিশিষ্ট – ১ দ্রষ্টব্য)?

মৌলিক বিষয়গুলির সমাধান না করে, মৌলিক বিষয়ের পরিপূর্ণ অকাট্য জ্ঞান অর্জন না করে উপরের স্তরে গেলে তখন বিভক্তি, মতবিরোধ ও শত্রুতা, ইত্যাদি সৃষ্টি হয়। অতএব, যখন কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করে সকল গ্রুপই তাদের নিজেদের দিকে ডাকছে, তখন সবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চিন্তামগ্ন হওয়া উচিত যে, ইসলামের নামে এসব কী হচ্ছে? ইসলাম আসলে কী? আক্বল, তাওহীদ, আখিরাত, রিসালাত, ইমামত, কিতাবুল্লাহ ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ে দৃঢ় জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।

বিদ্বেষ/ বিরোধিতাপ্রসূত জ্ঞান অর্জনের সমস্যা : anti-ism

কোনো দল বা গ্রুপের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে যখন কেউ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে, তখন সেটা আংশিক ও পক্ষপাতদুষ্ট জ্ঞান হয়ে যায়। তরুণদেরকে মোটিভেট করা অপেক্ষাকৃত সহজ, একারণে দেখা যায়, খুব সহজেই তারা বিভিন্ন ধর্মীয় দলের সাথে ভিড়ছে। এরপর কোনো কারণে যদি সে এক দল ছেড়ে আরেক দলে গিয়ে যোগ দেয়, তখন প্রথম দলের দোষ-ত্রুটি প্রচারে বিরাম রাখে না। এমনকি দেখা যায় যে, এতদিন নিজে যেই দল করতো, এখন সে-ই হয়েছে ঐ দলের সবচে বড় শত্রু, ঐ দলের সবচেয়ে বড় বিরোধিতাকারী। এরকম উদাহরণ চারপাশে তাকালেই দেখা যাবে, বিশেষতঃ তরুণ সমাজের মাঝে।
তখন দেখা যায় ইসলামকে মূল লক্ষ্য করার পরিবর্তে তার মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হয়ে যায় তারই অতীত দলটার সমালোচনা করা, ঐ দলটাকে দমন করা। এ ধরণের anti-ism দ্বারা মোটিভেটেড হয়ে যেসব কর্মকাণ্ড করা হয়, তা যদিওবা ইসলামের খোলসে হয়, তা আসলে শয়তানের হাতিয়ার। একটা সহজ উদাহরণ হলো, শিয়া-সুন্নি বিরোধ। কেউ যখন সুন্নি সমাজে বড় হয়ে ওঠে, এবং একজন শিয়া মুসলমানের যুক্তির মুখোমুখি হয়, তখন সে বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যেই শিয়া-সুন্নি ইস্যু নিয়ে পড়াশুনা শুরু করে। যেহেতু তার উদ্দেশ্যেই শিয়াদের বিরোধিতা করা, তখন সে আসলে আর নিরপেক্ষ নাই, বরং পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়েছে। এরপর সে যতই পড়াশুনা করুক না কেনো, তার অর্জিত জ্ঞান হবে পক্ষপাতদুষ্ট, এবং সেখানে প্রকৃত সত্য উঠে আসবে না। একারণে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের অনুপ্রেরণা আসতে হবে নিরপেক্ষভাবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, মানব সত্তার গভীর হতে উৎসারিত হয়ে, নিজের উৎসের সন্ধানের তাড়না থেকে, স্রষ্টাকে জানার ব্যাকুলতা থেকে। এছাড়া অন্য কোনো কিছু দ্বারা মোটিভেটেড হয়ে কেউ যদি ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে, তাহলে নিরপেক্ষ সত্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তার নেই বললেই চলে।

ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতির সমস্যা : introduction of new concept

ইসলামের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। কিন্তু বিশ্বে ইসলাম প্রচারে দল পদ্ধতির উদ্ভব ঘটেছে সাম্প্রতিককালে। একটি ব্যানার তৈরী করে তার নিচে বিভিন্ন মানুষ সমবেত হয়ে বিভিন্ন ইসলামী কর্মকাণ্ড করছে। এটা সুস্পষ্ট যে, ইসলাম প্রচার কিংবা ইসলামী কর্মকাণ্ড করার জন্য মুহাম্মদ (সা.) কোনো নাম দিয়ে দল তৈরী করেননি। অর্থাৎ, বর্তমানে আমরা যে ইসলামী দলগুলো দেখি, অনুরূপ concept আল্লাহর রাসূল (সা.) প্রণয়ন করেননি। আল্লাহ রাসূল (সা.) যা করেননি, যা বিগত হাজার বছরেও প্রয়োজন হয়নি, এখন হঠাৎ কেনো তা প্রয়োজন হচ্ছে? যারা ইসলামের নামে বিভিন্ন দল প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সেই দলের নেতা-কর্মী, তারা অবশ্যই এর পক্ষে নানান যুক্তি উপস্থাপন করবেন। স্পষ্টতঃই সেগুলো কুরআন-হাদীস-ইসলামের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা, partial representation, ইসলামের প্রাথমিক স্তরসমূহের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং না থাকা ও জ্ঞান অর্জনের সঠিক পন্থা অনুসরণ না করার ফসল। প্রতিটা গ্রুপই নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা (বা অপব্যাখ্যার) রেফারেন্সিয়াল যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আহবান জানায়, এবং মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে নিজের মতকে বাহ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। অথচ ইসলামের দ্বীন হিসেবে পরিপূর্ণতা মানে কী? দ্বীন হিসেবে ইসলামের পরিপূর্ণতার মানে হলো, concept হিসেবে ইসলাম পরিপূর্ণ। এখন, এই কনসেপ্ট স্থান-কাল-পাত্র-পরিবেশ-সভ্যতা ইত্যাদি ভেদে একই থাকবে। যেমন, মুহাম্মদ (সা.) ইসলাম প্রচার করেছেন। সেই যুগে মাইক ছিলো না, তিনি প্রয়োজনে পাহাড়ের উপরে উঠে মানুষকে ডেকে কথা বলেছেন। এই যুগে মাইক্রোফোন আছে, টিভি-ইন্টারনেট-ভিডিও স্ক্রিন ইত্যাদি আছে, কিন্তু এগুলো ব্যবহার করেও আমরা কনসেপ্টটাকে সমুন্নত রাখতে পারি, আর তা হলো : একজন ধর্মপ্রচারক কথার মাধ্যমে মানুষকে সরাসরি ইসলামের দিকে, আল্লাহর দিকে আহবান করবেন। তিনি ইসলামের জন্য কোনো নাম দিয়ে দল তৈরী করেননি, এবং মানুষকে সেই দলের পতাকাতলে সমবেত হবার আহবান জানাননি। অর্থাৎ দলের কনসেপ্ট আল্লাহর রাসূল (সা.) ইন্ট্রোডিউস করেননি।
নবীজি যুদ্ধের কনসেপ্ট দিয়ে গেছেন। সেই যুগের সভ্যতায় যুদ্ধের কনসেপ্ট ঘোড়া, তলোয়ার, তীর ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে কাজ করেছে। বর্তমান যুগে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রকে কেন্দ্র করে কাজ করবে, কিন্তু কনসেপ্ট একই থাকবে।

এখানে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা দরকার যে, নবীর দায়িত্ব-কর্তব্য কী। নবী তাঁর দায়িত্ব, অর্থাৎ ইসলাম প্রচার যেই পন্থায় পালন করেছেন, সেই পন্থা পরিপূর্ণ, এবং সেই পন্থার সংস্করণের প্রয়োজন বা এখতিয়ার, কোনোটিই আমাদের নেই। কিন্তু অন্যান্য বিষয়, যেমন অস্ত্র তৈরী বা গৃহনির্মাণ, ইত্যাদি যেগুলো নবীর মূল দায়িত্ব নয়, সেক্ষেত্রে নবীর গৃহীত পদ্ধতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়। এবং এক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি (গৃহনির্মাণ পদ্ধতি, অস্ত্র তৈরী ও চালনা পদ্ধতি ইত্যাদি) আমরা উদ্ভাবনও করতে পারি, এবং পুরনো পদ্ধতির সংস্কারও করতে পারি। কিন্তু নবীর মূল যে দায়িত্ব, সেই পদ্ধতিতে, সেই কনসেপ্টে হাত দেয়ার এখতিয়ার আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দেননি। কেউ যদি তা করে, অর্থাৎ নবীর যে দায়িত্ব ছিলো, সেই একই দায়িত্ব দ্বীন প্রচারে নবীর অনুসৃত মূলনীতি, পন্থা, কনসেপ্ট অনুসরণ না করে, তবে সে নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করবে, যা স্পষ্টতঃ নিষেধ, যা কিনা নবীর জ্ঞানকে অসম্পূর্ণ মনে করা, দ্বীন হিসাবে ইসলামের কমপ্লিটনেসকে অস্বীকার করা।

আসলে ইসলামের মৌলিক বিষয়ের জ্ঞান এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, শাখা-প্রশাখাগত সব বিষয় বাদ দিয়ে আগে মৌলিক বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান অর্জন করা উচিত। কেউ যখন নবীকে পরিপূর্ণভাবে না চেনে, তখন সে নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করে। কিংবা নবীর আদেশের তুলনায় কম কাজ করে। দুটোই আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করেছেন। শেষ নবী, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দ্বীনকে পূর্ণ করে দিয়েছেন, তাকে চিনতে হবে আগে!

যারা ইসলামের নামে বিভিন্ন নাম দিয়ে দল প্রতিষ্ঠা করেছেন, এবং সেটার পক্ষে বিভিন্ন রেফারেন্স এনে ইসলামের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করছেন, তাদের চিন্তা করে দেখা উচিত যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) কি জানতেন না? দলের কনসেপ্ট কি তাঁর ছিলো না? Conceptually ইসলামের পরিপূর্ণতার মানে হলো এই যে, ইসলাম ও ইসলাম সংক্রান্ত যত কর্মকাণ্ড, যা একজন নবীর দায়িত্ব-কর্তব্য, সেগুলোর conceptual পরিপূর্ণতা। অর্থাৎ, নীতিগতভাবে, পদ্ধতিগতভাবে মুহাম্মদ (সা.) যা করেছেন, কেয়ামত পর্যন্ত একই কনসেপ্ট ব্যবহার করা যাবে, যুগের সাথে সেই কনসেপ্ট অকার্যকর হয়ে পড়বে না। কনসেপ্ট হিসেবে ইসলামের পরিপূর্ণতা বুঝতে না পারলে তখনই মানুষ ইসলাম প্রচারের জন্য এমন নতুন পন্থা আবিষ্কার করে, যা আল্লাহ রাসূল (সা.) করেননি।

সাময়িকভাবে দলীয় পদ্ধতিতে ইসলামের প্রচার-প্রসার যদি সাফল্য এনেও দেয়, তবুও সেটাকে পরিহার করতে হবে এই যুক্তিতে যে, নবী তাঁর দায়িত্ব পালনে যেই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যেই কনসেপ্টের অনুসরণ করেছেন, সেই একই দায়িত্ব পালনে আমরা ভিন্ন কোনো কনসেপ্ট ব্যবহারের অধিকার রাখি না। ইসলাম প্রচার করা নবীর দায়িত্ব ছিলো, অতএব এই কাজটি তিনি যেভাবে করেছেন, হুবহু একই কনসেপ্ট আমাদেরকে অনুসরণ করতে হবে। এর কম-বেশি করা যাবে না। এর কম-বেশি করার অর্থই হলো নবীর জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করা, আর নবীর জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করা মানে আল্লাহর জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করা। আল্লাহ তা'আলা যখন কুরআনকে শেষ ঐশী কিতাব করেছেন, মুহাম্মদ (সা.)কে যখন শেষ নবী করেছেন এবং ইসলামকে যখন পূর্ণতা দান করেছেন, তখন এসবেরই অর্থ হলো এই যে, কেয়ামত পর্যন্ত ঐ কনসেপ্টগুলো ব্যবহার-উপযোগী থাকবে, যুগের সাথে কিংবা স্থান-কাল-পাত্র-পরিবেশ ইত্যাদি ভেদে অকার্যকর হয়ে যাবে না। এবং তার চেয়ে উন্নত কোনো কনসেপ্টও কখনো থাকা সম্ভব নয়, দ্বীনের কাজ করার জন্য নবীজির অনুসৃত পন্থার চেয়ে উন্নততর কোনো পন্থা থাকা সম্ভব নয়। তবে এই আধুনিক যুগে নতুন এমন কী অবস্থার উদ্ভব ঘটলো যে, শেষ নবী যেই কনসেপ্ট, যেই পদ্ধতি অনুসরণ করে দ্বীনের কাজ করেছেন, সেই পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে গেলো? কিংবা তার চেয়েও উত্তম কোনো পদ্ধতি আমরা সাধারণ মানুষেরা, যারা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে ওহী-ও পাই না, সেই সাধারণ মানুষেরা আবিষ্কার করবো?

এ ধরণের কাজ তখনই সম্ভব, যখন কেউ নবীকে চেনে না, নবীকে চিনলেও নবুওয়্যাতের সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখে না, কিংবা তা হলেও কনসেপ্ট হিসেবে ইসলাম, কুরআন ও মুহাম্মদের (সা.) কথা-কর্মের আধুনিকতা বোঝে না। ইসলামের যত বড় পণ্ডিতই হোক না কেনো, কেউ যদি শেষ নবীর যে দায়িত্ব ছিলো, সেই ইসলাম প্রচারের কাজে শেষ নবীর অনুসৃত কনসেপ্ট এর বাইরে অন্য কোনো কনসেপ্ট আবিষ্কার করে বা অনুসরণ করে, তখন অবশ্যই তিনি ইসলামের, কুরআনের ও শেষ নবীর কথা-কর্মের আধুনিকতা, সর্বজনীনতা ও স্থান-কালের-উর্ধ্ব কনসেপ্ট হওয়াকে পরিপূর্ণ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এরপর সেই দলের যদি লক্ষ-কোটি অনুসারীও হয়, এমনকি সেই দল যদি গোটা মুসলিম বিশ্বের অর্ধেককেও গ্রাস করে ফেলে, তবুও তারা সঠিক পথের উপর নাই, এবং নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করছেন। আর নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করলে আমল ধ্বংস হয়ে যাবার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।

ইসলামের মৌলিক বিষয়ে (তাওহীদ-আখিরাত-রিসালাত ইত্যাদি) সঠিক পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন ও প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে প্রতিটা স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং একারণে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ।

এই ফিলোসফিকাল আলোচনাগুলো কোথায় হবে? কাদের কাছে উপস্থাপন করা হবে? না ধর্মীয় দলগুলোর নীতিনির্ধারক ও নেতাগণ রিসার্চার যে, তাঁদের কাছে গিয়ে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে, আর না দেশে কমপ্লিট রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টার আছে যে, সেখানে বিষয়গুলো পেশ করা হবে। না আলেমসমাজ ঐক্যবদ্ধ যে তাঁদের সকলের কাছে বিষয়টি পেশ করা হবে। কোনো ধর্মীয় দল বা ধর্মীয় নেতার ধারণা যদি এমন হয় যে, প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন হয়ে গিয়েছে, এখন শুধু কাজ করে যেতে হবে, তখন ঐ মুহুর্ত থেকেই জ্ঞানচর্চার দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়। ধর্মীয় দলগুলোর এই অবস্থাই ঘটেছে। যখন কেউ নিজেদের প্রয়োজনে নিয়মিত জ্ঞানচর্চা করে না, তখন তাদের কাছে এসব মৌলিক ফিলোসফি উপস্থাপন করেও খুব একটা লাভ হয় না। অথচ ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতি ইসলামের ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনছে, যদিও বাহ্যিকভাবে কখনো কখনো এর ভালো ফলাফল দেখা যায়। ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতির সমস্যার আলোচনা conceptual level এ আপাততঃ এটুকুই যথেষ্ট।

ইসলামী দল

ইসলামের নামে দেশে-বিদেশে বহু দল আছে। তিউনিশিয়া, মিশর, তুরস্ক, বাংলাদেশ...। বিভিন্ন দলের কার্যক্রম, সাফল্য-ব্যর্থতা বিভিন্ন রকম। কোনো একটি দলের সাফল্য-ব্যর্থতা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত না যে দল পদ্ধতি ইসলামে বৈধ কিনা, বরং conceptual level এ দল পদ্ধতিকে বিচার-বিশ্লেষণ করা উচিত। উপরে conceptual level এ ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতির সমস্যা নিয়ে একটু আলোচনা করেছি। এখানে বাংলাদেশে আমাদের সুপরিচিত ও সবচেয়ে বড় ইসলামী দলটার দিকে উপরোক্ত conceptual discussion এর প্রেক্ষিতে আলোকপাত করা যেতে পারে।

মওলানা মওদূদীর (রহ.) হাত ধরে জামায়াতে ইসলামী যখন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন তিনি যে গুটিকয়েক মানুষকে সাথে নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন, তাঁদের তাক্বওয়া, জ্ঞান, নিষ্ঠা – কিছুরই কমতি ছিলো না। প্রথম যখন এই দল প্রতিষ্ঠা হলো, তখন অল্প সময়ের মাঝে ইসলামের বেশকিছু কাজ করা সম্ভব হলো। আগে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিবর্গ ইসলামের যেটুকু কাজ করতেন, এখন দলবদ্ধ হয়ে কাজ করায় কম সময়ে বেশি ফলাফল পাওয়া গেলো। একটা স্ট্রাকচার দাঁড় করানো হলো। বিভিন্ন পদ-পদবী তৈরী করা হলো। জেলা-থানা-শাখা ইত্যাদি ডিভিশান হলো। সময়ের সাথে সাথে দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকের সংখ্যা বাড়লো, কলেবর বাড়লো। দলের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড, ইসলামী বইপুস্তক বিলি করাসহ নানান ধর্মীয় কর্মকাণ্ড চোখে পড়ার মত করে সমাজে বৃদ্ধি পেলো। এগুলো সবই ভালো দিক, নিঃসন্দেহে। কিন্তু যে ব্যক্তির conceptual level এ ইসলামের কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য দল পদ্ধতির বিরোধী, এই সাময়িক বা বাহ্যিক ভালো কর্মকাণ্ড দেখলেও তিনি দল পদ্ধতির বিরোধিতাই করবেন। কারণ, তিনি জানেন যে, ইসলামের প্রচার-প্রসারে দল পদ্ধতি সর্বোত্তম পন্থা নয়। যদি এটা সর্বোত্তম পন্থাই হতো, তবে এই কনসেপ্ট আল্লাহ রাসূল (সা.) দিয়ে যেতেন। দ্বীন (ইসলাম), নবী (মুহাম্মদ), ঐশী কিতাব (কুরআন) ও স্রষ্টা (আল্লাহ) সম্পর্কে যার conceptual level এ ফিলোসফিকাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে, সে ব্যক্তি অবশ্যই এজাতীয় দল পদ্ধতির বিরোধিতা করবে, কারণ আল্লাহ তা'আলাকে পরম জ্ঞানী বলে সে জানে ও মানে, খতমে নবুওয়্যাতকে সে উপলব্ধি করেছে, এবং কনসেপ্ট হিসেবে দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণতা, অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ-উর্ধ্ব সর্বজনীনতা সম্পর্কে তার আস্থা আছে।

এরপর একজন স্কলারের চিন্তাপ্রসূত দলটির একটি স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে গেলো। সেই স্ট্রাকচারে অসংখ্য মানুষ এসে জড়ো হতে লাগলো। কিন্তু এই দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বা সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে কোনো রিসার্চ সেন্টার ছিলো না। যদি থাকতো, তবে হয়তো কোনোদিন সেই রিসার্চ সেন্টারে এই ফিলোসফিকাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংগুলোকে রিয়ালাইজ করা হতো, এবং তখন রিসার্চ সেন্টারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দলটিকে বিলুপ্ত করা হতো। কিংবা আজও যদি দলটির সর্বোচ্চ ক্ষমতা / নেতৃত্ব একটি নিরপেক্ষ, স্বাধীন রিসার্চ সেন্টারের হাতে থাকতো, তবে সেখানে গিয়ে এই ফিলোসফিকাল আলোচনাগুলোকে পরিপূর্ণ আকারে পেশ করা যেত; এরপর আশা করতে পারতাম যে, তাদের উপলব্ধি হবে এবং দলটিকে বিলুপ্ত করে দিয়ে তাঁরা ইসলামের কাজ অব্যাহত রাখবেন, তবে নবীজির (সা.) অনুসৃত কনসেপ্টে, নিজেদের আবিষ্কৃত পন্থায় নয়।

কিন্তু তা হয়নি। যদিও দলের অধীনে কিছু "রিসার্চ সেন্টার” আছে, কিন্তু সেগুলো প্রকৃত অর্থের কোনো রিসার্চ সেন্টারই নয়। বিভিন্ন পেশাজীবি চাকুরিজীবি চিন্তাশীল মানুষেরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর যেটুকু সময় পান, এবং সেই সীমিত সময়ে ইসলাম নিয়ে যেটুকু চিন্তা-ভাবনা করেন, সেটাই ঐ রিসার্চ সেন্টারে পেশ করা হয়। Full-fledged research center নয় সেগুলো। যারা উন্নতবিশ্বের বিভিন্ন রিসার্চ সেন্টার / রিসার্চ একাডেমি সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা জানেন যে, পূর্ণাঙ্গ রিসার্চ সেন্টার কী জিনিস। সেই অর্থে জামায়াতের এই রিসার্চ সেন্টারগুলো কোনো রিসার্চ সেন্টারই নয়।

দ্বিতীয়তঃ, এই রিসার্চ সেন্টারগুলো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারনী নয়। এগুলোর কর্মকাণ্ড কেবল কিছু পাবলিকেশানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রিসার্চারগণ, আলেমগণ কিংবা জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ যদি স্বাধীন না হন, তারা যদি কারো বেঁধে দেয়া সীমারেখায় জ্ঞানচর্চা করেন, তবে তার ফলাফল কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। জামায়াত ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর কর্মীদের নির্দিষ্ট সিলেবাসের কিছু বই পড়তে হয়, কিন্তু সেখানে সাধারণত এই রিসার্চ পেপারগুলো থাকে না। এরকম কিছু রিসার্চ সেন্টার থেকে প্রকাশিত কিছু রিসার্চ পেপার পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি, সেখানে কোনো কোনো ব্যক্তি খুবই যৌক্তিক কিছু বিষয় উত্থাপন করেছেন, কিন্তু তার আট-দশ বছর পরেও সংগঠনে সেই যৌক্তিক চিন্তার প্রতিফলন নেই। এর কারন হলো, সংগঠনের উপর কোনো কর্তৃত্বই আসলে ঐ রিসার্চ একাডেমীর নেই। সংগঠন চলছে সেই একজন স্কলারের দিয়ে যাওয়া স্ট্রাকচার অনুসারে। আর রিসার্চ একাডেমীগুলো সেটার অধীন হয়ে কাজ করছে এমনভাবে যে, তারা মূল স্ট্রাকচারে হাত দিতে পারবেন না। অর্থাৎ, মওলানা মওদূদীর (রহ.) যদি কোনো ভুল হয়ে গিয়েও থাকে, তবুও বংশ পরম্পরার মত সংগঠনটি সেই ভুলকেই লালন করে আসবে। কোনো রিসার্চার যদি সেই ভুল দেখিয়েও দেন, তবুও সংগঠনে সেটার প্রতিফলন হবে না, কারণ জ্ঞানী ব্যক্তিদের (রিসার্চারদের) প্রকৃত মর্যাদা এখানে করা হচ্ছে না।

আমার যা মনে হয়েছে তা হলো, এই নামকাওয়াস্তে রিসার্চ সেন্টারগুলো সমাজের ইসলাম নিয়ে চিন্তিত ব্যক্তিদেরকে একপ্রকার বুঝ দিয়ে শান্ত করার ব্যবস্থা। কারণ তাদের চিন্তা ও রিসার্চের ফসল ঐসব প্রকাশিত বইয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ, এমনকি সেগুলো তাদের জনশক্তিকেও (অনুসারী) পড়তে দেয়া হয় না, পাছে তাতে সংগঠনের ঐতিহ্যিক কর্মকাণ্ড প্রভাবিত হয়!

এভাবে, প্রথমতঃ কোনো পূর্ণাঙ্গ রিসার্চ সেন্টার না থাকা, দ্বিতীয়তঃ সেই রিসার্চ সেন্টারকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সর্বোচ্চ ক্ষমতা না দেওয়ার ফলে সংগঠনের ভুল-ত্রুটির সংশোধন হচ্ছে না, হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই, বরং নিষ্ঠার সাথে এর অনুসারীরা দোষ-ত্রুটিগুলোকেও লালন করে যাচ্ছে। আর তার ফলাফল হলো বর্তমান জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো। মওলানা মওদূদীর (রহ.) প্রতিষ্ঠিত সেই জামায়াতে ইসলামী আর বর্তমান জামায়াতে ইসলামীর আকাশ পাতাল ফারাক। কারণ ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়। যুগের সাথে সাথে এবং সংগঠনের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে এতে বিভিন্ন স্তরে অনেক অন্যায়-অপকর্ম ও দোষ-ত্রুটির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, কিন্তু সেগুলো সংশোধন কিংবা উন্নয়নের কোনো সুযোগ সাংগঠনিক স্ট্রাকচারেই না থাকায় দিনদিন অবনতি ঘটছে। নৈতিক অবনতি, স্ট্র্যাটেজিকাল অবনতি, জ্ঞানগত অবনতি...। সংগঠনে যেকোনো সময় ডাইন্যামিকালি যেকোনো ধরণের পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকা উচিত ছিলো, এবং এই এখতিয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ রিসার্চ সেন্টারের হাতে থাকা উচিত ছিলো। সেটা না থাকায় এক প্রকার জড়তা নিয়ে সংগঠন চলছে, এবং সময়ের সাথে সাথে এতে নানান দোষ-ত্রুটির অনুপ্রবেশ ঘটছে, আর দোষ-ত্রুটির অনুপ্রবেশ যাদের হাত দিয়ে ঘটছে, তারাই সংগঠনের পিলার, কিংবা দেয়ালের ইট। তারপর সেই দোষ-ত্রুটি, জ্ঞানগত অবনতি, নৈতিক অবনতি ও স্ট্র্যাটেজিক অবনতিকে তারা বংশধারায় পাওয়া মূল্যবান সম্পদের মতই নিষ্ঠাসহকারে লালন করে যাচ্ছেন।

গোড়াতেই ইসলাম প্রচারের জন্য নবীর অনুসৃত পন্থার বাইরে নতুন পন্থা আবিষ্কার করাটা ভুল হয়েছিলো। এরপর প্রথমে দেখতে সবকিছু ভালোই লাগছিলো, কিন্তু ধীরে ধীরে দল পদ্ধতির সমস্যাগুলো প্রকাশ পেতে লাগলো। সময়ের সাথে আজকে তা সাধারণ মানুষের চোখেই প্রকাশ্য, যা একসময় শুধু জ্ঞানী ও চিন্তাবিদেরা বুঝতে পারতেন। সময়ের সাথে সাথে সাংগঠনিক জড়তা সহকারে জামায়াত-শিবির যতই অগ্রসর হবে, ততই শয়তান নিত্য-নতুন কৌশলে এর মাঝে ক্ষতিকর জিনিসের অনুপ্রবেশ ঘটাবে। কারণ এখানে একটা জিনিস আছে, তা হলো দলীয় আনুগত্য। দলের অনুসারীরা নিষ্ঠা সহকারে দলকে আঁকড়ে ধরে থাকে, দলের আনুগত্য করে। দল তো আর মানব-বিচ্ছিন্ন কোনো আর্টিফিশিয়ালি ইন্টেলিজেন্ট এজেন্ট না, বরং যখন কোনোকিছুকে "দলীয় সিদ্ধান্ত” বলে ঘোষণা করা হয়, তখন সেই সিদ্ধান্ত আসলে গুটিকয়েক মানুষের গৃহীত সিদ্ধান্ত। আর এই গুটিকয়েক নীতিনির্ধারক মানুষেরা যদি একটি ভুল সিদ্ধান্ত দেন (এবং অসংখ্য দিয়েছেনও), তখন গোটা জনশক্তি সেটাকে নিষ্ঠা সহকারে লালন করে। শয়তান ও শয়তানের এজেন্টদের লক্ষ্যই থাকে সেই নীতিনির্ধারণী পদ দখল করা, অতএব কিছু লোক খুব দ্রুত চমৎকার আনুগত্য ও আমলের নিদর্শন দেখিয়ে উপরের পদে উঠে যান।

বিভিন্ন জিনিস উপহার দেয়া, কিংবা হোটেল রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ানো, ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদেরকে সংগঠনের টাকায় ট্যুরে নিয়ে যাওয়া, দরিদ্র ছাত্রদেরকে টিউশনি যোগাড় করে দেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে দলে টানার চেষ্টা করা হয়। আরো যে কত অসংখ্য নীতি বিবর্জিত কাজ করা হয়, তা লিখতে গেলে লেখার মাঝে কলুষ প্রবেশ করবে। একজন যখন বাইরে থেকে জামায়াত-শিবিরকে দেখে, তখন বেশ ভালো লাগতে পারে। এরপর যখন সে সমর্থক থেকে শুরু করে কর্মী, সাথী, সদস্য ইত্যাদি উপরের স্তরে প্রবেশ করতে থাকে, ততই তার কাছে প্রকাশ পেতে থাকে দলের dirty secrets, darkness। কিন্তু ততদিনে সে সংগঠনের সাথে "জড়িয়ে গেছে”, তাই তার পক্ষে আর বের হয়ে আসা সম্ভব হয় না। এরপরও গুটিকয়েক সাহসী মানুষ যদিওবা বেরিয়ে আসেন, তাদেরকে সংগঠনের পক্ষ থেকে মুরতাদ আখ্যা দেওয়াসহ তার ব্যাপারে গোটা সংগঠনে অপবাদ ও নেগেটিভ কথাবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেনো তার যৌক্তিক কথায় আরো কেউ দল থেকে বেরিয়ে না যায়।

কিন্তু তারাও যদি সঠিক পন্থায় জ্ঞানচর্চা না করে, তখন দেখা যায় তাদের কারো ধ্যান-জ্ঞান হয়ে পড়ে জামায়াত-শিবিরের বিরোধিতা করা, কেউবা আবার আরেক দলের পাল্লায় পড়ে, যারা একইভাবে কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ অপব্যাখ্যা করে নিজেদেরকে জাস্টিফাই করছে। প্রত্যেকেই কুরআন ও "সহীহ হাদীস” থেকে রেফারেন্স দেয় নিজেদের পক্ষে, অথচ এটা নিজেদের মাথায়ই ক্লিক করে না যে, কিভাবে করে একই কুরআন ও একই "সহীহ” হাদীসের অনুসারীরা পরস্পবিরোধী হলো! কিন্তু তারা প্রত্যেকেই যদি কুরআন ও হাদীস থেকে সঠিক পন্থায় জ্ঞান অর্জন করতো, সঠিক পদ্ধতিতে তাৎপর্য গ্রহণ করতো, তাহলে আর এই পরস্পরবিরোধিতা থাকতো না।

এখন, “দলের স্বার্থে” এই সব কর্মকাণ্ডেরই বৈধতা দিয়ে থাকে তারা। প্রথমতঃ, ইসলামের সংকীর্ণ উপস্থাপনের মাধ্যমে, কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার (বা অপব্যাখ্যার) মাধ্যমে দলকে বৈধতা দেয়া হয়, এরপর "দলীয় স্বার্থের” নাম করে যেকোনো কাজকে বৈধতা দেয়া হয়।
দলের নাম প্রচারের জন্য ব্যানার টানিয়ে দুস্থ মানুষকে দান-সদকা করা হয়, সেইসাথে তাদের তোলা হয় ছবি! এটা যে কত বড় ইসলামবিরোধী কাজ! দুস্থ মানুষকে গোপনে দান করতে হবে, তার মান-সম্মান নষ্ট হয়, এমনভাবে দান করা যাবে না, ইত্যাদি জ্ঞান কুরআন-হাদীস থেকে তারাই পেয়ে থাকে, কিন্তু "দলীয় স্বার্থে” দলের প্রচার-প্রসারের জন্য এই কাজটি করে থাকে।

বায়তুল মাল নামে যে টাকার ফান্ড তৈরী করা হয়েছে, তা সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের "নেতৃবৃন্দ” তাদের বুঝমতন ব্যয় করে যাচ্ছে। হোক সেটা জামায়াতে কি শিবিরে। প্রথমতঃ, এখানে কোনো ইসলামী রাষ্ট্রই নেই যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কনসেপ্ট আসবে। দ্বিতীয়, এই কোষাগার থেকে কিভাবে কোথায় কী ব্যয় হবে, তা ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অনুমোদনক্রমে ও নির্ধারিত সীমায় ব্যয় হবে। অথচ নাম বায়তুল মাল দেয়া হলেও সেই টাকা দিয়ে "সাংগঠনিক ট্যুর” এর নামে দলীয় লোকজনকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ট্যুরে যাওয়া, কোনো উর্ধ্বতন দলীয় নেতা আসলে ব্যাপক খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা, নানান প্রোগ্রামে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে ফুলসহ নানান জিনিস দিয়ে সাজানো, ইত্যাদি সবই করা হচ্ছে। এ-ই কি হযরত ওমরের (রা.) বায়তুল মাল? কিংবা হযরত আলীর (রা.)? অথচ সর্বোচ্চ নৈতিকতার অনুপম নিদর্শনের এই কথাগুলো তারাই আবার সিলেবাসভুক্ত বইয়ে পড়ছে।

"বাইয়াত" এর প্রকৃত ইসলামিক কনসেপ্ট আর জামায়াত শিবিরে যে বাইয়াত চালু আছে, তা এক নয়। আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত নবীর কাছে যে আনুগত্য, সে আনুগত্য ভঙ্গ করলেই মানুষ ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়, কিন্তু জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব, যারা অধঃস্তনদের আনুগত্য কিনে থাকেন, তারা কেউ-ই আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত নন, বরং তাদের জ্ঞানগত ও আমল-আখলাকের বহু ত্রুটি সাধারণ চোখেই ধরা পড়ে। এমতাবস্থায় তাদের আনুগত্যকে রাসূলের (সা.) আনুগত্যের সাথে এক কাতারে ফেলাটা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে কুরআন-হাদীসের অপব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।

দলের "নেতাদের রক্ষা করাটা” "দলীয় স্বার্থে" প্রয়োজন, আর "আমাদের দল হলো ইসলামের স্বার্থে"। অতএব যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অংশগ্রহণ করতে হবে, যদিও তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থনা করার ব্যাপারে কুরআনে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে। তারপর যখন ইসলামের স্বার্থে দল, দলের স্বার্থে নেতা, নেতাকে রক্ষার্থে (তাগুতের) কোর্টে অংশগ্রহণ, এবং "ট্রাইব্যুনালে অংশগ্রহণের স্বার্থে” দেশ-বিদেশ অসংখ্য জায়গায় বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানকে ঘুষ দেয়া হচ্ছে, তখন সবই জায়েজ! এইভাবে করে নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো যা খুশি তারা করে যাচ্ছে, এবং সবকিছুকেই "দলীয় স্বার্থে” বলে বৈধতা দান করছে, যেহেতু শুরুতেই দলকে (ইসলামের বিকৃত ও আংশিক ব্যাখ্যা দ্বারা) বৈধতা দান করেছে।

সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার যেটা ঘটে তা হলো, বারবার দলের নাম, দলের জন্য, দলীয় স্বার্থ, দলের নেতা ইত্যাদি শুনতে শুনতে ও এগুলোর জন্য কাজ করতে করতে জনশক্তির মাঝে স্ট্যান্ডার্ড ও লক্ষ্য সেট হয়ে যায় "দল"। তা সেটা তারা মুখে স্বীকার করুক বা না-ই করুক। দলের প্রচার-প্রসার, দলের কর্মী বৃদ্ধি, ইত্যাদি ইত্যাদি...। তখন কোনো জিনিসকে যদি দেখিয়ে বলা হয় যে, তোমাদের এই কাজটি ইসলামবিরোধী, তখন সেটা মন থেকে মানতে পারে না। কারণ সেটাতো সংগঠনবিরোধী না! এটা কি করে হয় যে, যে কাজ সংগঠনের উপকারের জন্য করা হচ্ছে, তা ইসলামবিরোধী হবে? কারণ সংগঠনই তো ইসলামী সংগঠন, এটিই তো জান্নাতি সংগঠন...। ইত্যাদি অনুভুতি তখন পেয়ে বসে। দলীয় প্রেজুডিস গ্রাস করে, এবং এই জিনিসটা সবচেয়ে ক্ষতিকর।

হরতালে গাড়ি ভাঙচুর, বিভিন্ন জায়গায় আগুন দেয়া, গাছ কেটে / উপড়ে ফেলা, ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের বৈধতা কী? উত্তর হলো দলীয় স্বার্থে, আর দল ইসলামের স্বার্থে। কেউবা আবার একটু অগ্রসর হয়ে কুরআন-হাদীসের কিছু রেফারেন্স আনার চেষ্টা করেন। অথচ গাছ কাটা / উপড়ে ফেলা প্রসঙ্গে কুরআন-হাদীসে যে রেফারেন্সগুলো এসেছে, সেগুলো যুদ্ধের ময়দানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। হরতাল কি যুদ্ধ? নিরস্ত্র অবস্থায় সশস্ত্র শত্রুর মুখোমুখি হওয়াটা কি যুদ্ধ? ইসলাম কি এমন যুদ্ধ করতে বলেছে? শত্রুকে (পুলিশকে) হত্যা করবো না, কিন্তু আঘাত করবো, এই নীতি নবীজি কবে দিয়েছেন? ইসলামে যুদ্ধ হলো প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রকে হেফাজত করার জন্য, এমনকি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যও নয়। এর আগ পর্যন্ত নীরবে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যেতে হবে। হয় সশস্ত্র যুদ্ধ, নয় নীরব দাওয়াত, কিন্তু এর মাঝামাঝি কোনো আধা-যুদ্ধ বা হরতাল বলে ইসলামে কিছু নেই। অথচ (প্রথমতঃ) নবীর সুন্নাত থেকে বেরিয়ে এসে দল প্রতিষ্ঠা করে, এরপর দলের জন্য কাজ মানেই ইসলামের জন্য কাজ বলে, অতঃপর দলীয় স্বার্থে এমনকি স্পষ্ট কুরআনবিরোধী ও বিবেকবিরোধী কাজও অবলীলায় করে যাচ্ছে, কারণ সেটা করছে দলের স্বার্থে, আর দল হলো ইসলামের স্বার্থে! প্রয়োজনে নাকি হারামও হালাল হয়ে যায়।

সমস্যা হলো, জামায়াত-শিবিরের জনশক্তিকে সিলেবাসভুক্ত বই পড়তে হয়। এবং শুরুতেই তাদেরকে নিজেদের দলকে ও দলীয় কর্মকাণ্ডকে ডিফেন্ড করার জন্য কুরআন থেকে কিছু আয়াত, কিছু পছন্দমতো হাদীস ইত্যাদি মুখস্ত করানো হয়, যেনো তা দ্বারা মানুষকে দলে টানতে পারে, এবং প্রশ্নের সম্মুখীন হলে ঐসব রেফারেন্স দিয়ে নিজেদেরকে ডিফেন্ড করতে পারে। অথচ এগুলো সবই ইসলামের আংশিক উপস্থাপন, কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা। স্বাভাবিকভাবেই তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে জাস্টিফাই করার জন্য মানুষকে রেফারেন্সের ময়দানে নিয়ে যাবে, এবং সেখানে তার অস্ত্র তো প্রস্তুত আছেই : কুরআন থেকে quote mining করে বের করা কিছু আয়াত ও কিছু পছন্দমতো হাদীস। অথচ এই একই রেফারেন্সের ময়দানে যে তাদের বিরোধিতা করার মত অসংখ্য রেফারেন্স আছে, তা তারা নিজেরাও হয়তো জানে না। আর যেসব সাধারণ মানুষকে ঐসব কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে ডাকা হয়, তারাতো ধর্মীয় রেফারেন্সের ব্যাপারে আরো অজ্ঞ।

এইভাবে করে কুরআন হাদীস থেকে পছন্দমতো অংশ তুলে নিয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে জাস্টিফাই যে শুধু জামায়াত-শিবির করছে তা না, প্রতিটি দল/মতই করছে। এবং বেশিরভাগই সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে এই কাজগুলো করছে। অথচ এটা যে কত বড় ভয়ানক কাজ, কিতাবুল্লাহ (কুরআন) যে ছেলেখেলার বস্তু নয়, মুহাম্মদের (সা.) অনুসারী বলে নিজেকে দাবী করে তাঁরই পন্থা ও শিক্ষার বিপরীত কাজ করার ভয়াবহতা যে কতখানি – সে সম্পর্কে এই রেফারেন্স যোদ্ধারা বেখবর। ঐশী কিতাবের মর্যাদা না জেনেই কুরআনকে নিয়ে যা-খুশি-তাই করছে। খোদায়ী কিতাবের মর্যাদা বুঝতে হলে প্রথমে খোদাকে চিনতে হবে, তাঁর মর্যাদা মাহাত্ম্যকে পূর্ণশক্তিতে অনুধাবন করতে হবে। নবীর মর্যাদা অনুধাবন করতে হবে, নবীকে বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে চিনতে হবে। কিন্তু এই মৌলিক বিষয়ের কমপ্লিট জ্ঞানগত ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি না থাকার ফলে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপ কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলকে (সা.) ছেলেখেলার বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলেছে, এবং এক আল্লাহ ও এক নবীর নাম করে পরস্পরকে কাফির-মুরতাদ ফতোয়া দেয়া, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করছে। ISIS, আল কায়েদাসহ চরমপন্থী যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপ আরব দেশে ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে, সেসব গ্রুপকেও একইভাবে হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে কুরআন-হাদীসের বিকৃত ব্যাখ্যা, ইসলামের partial representation

ইন্টারনেটের কল্যাণে শিবিরের সকল পর্যায়ের সিলেবাসের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। শত শত বই! শত শত বই কেনো, আট-দশটা মৌলিক গ্রন্থ ভালোভাবে অধ্যয়ন করলেই এক একজনের ইসলামী স্কলার হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ তাদের মাঝে সেরকম কেউ-ই নেই! আসলে এজাতীয় সিলেবাসের ফলে নিজেদেরকে জ্ঞানী ভাবার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। অথচ ঐযে, শুরুতে যে আলোচনা করেছিলাম, জ্ঞান অর্জনের সঠিক পদ্ধতি না জানার ফলে এত পরিশ্রম, এত বই পড়া কোনোই কাজে আসে না। যদি সত্যিই কাজে আসতো, তাহলে সারা দেশে লক্ষ লক্ষ কর্মী-সাথী-সদস্যের জ্ঞান গবেষণার ফলাফল হিসেবে আমরা বিস্ময়কর কিছু লক্ষ্য করতাম। এই শতাধিক বই পড়া এই লক্ষ লক্ষ ছেলেদের একজনও আসলে রিসার্চার নয়। নয়তো লক্ষাধিক রিসার্চারের এক মহাবিপ্লব দুনিয়ার ইতিহাসে লিখিত হতো।

জ্ঞানচর্চার সঠিক পদ্ধতি জানা নেই বলেই এভাবে করে সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছে। যারা শিবির করেছেন কিংবা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন যে, রিপোর্ট বইয়ে নিজের ফলাফল ভালো হিসেবে উপস্থাপনের জন্য কী করা হয়। সিলেবাসভুক্ত বই থেকে দায়িত্বশীল ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে পাশ / ফেল নির্ধারণ করেন, যার ভিত্তিতে তাকে উপরের পদে উঠতে দেয়া হয়। প্রথমতঃ, যে দায়িত্বশীল বিভিন্ন বইয়ের উপর অধঃস্তনের জ্ঞান যাচাই করেন, তিনি নিজেই ঐ বইগুলোর উপর পণ্ডিত নন, এবং তিনি কোনো রিসার্চারও নন, বরং বাস্তবতা এই যে, ঐ বইগুলো ব্যবহার করে মৌলিক ফিলোসফিকাল প্রশ্ন করা হলেই সেই দায়িত্বশীল নিজেই জবাব দিতে পারবেন না। দ্বিতীয়তঃ, দায়িত্বশীল কী কী প্রশ্ন করতে পারেন, তা-ও সাজেশান আকারে পাওয়া যায়। এভাবে করে দায়সারা বই পড়া ও দায়সারা পরীক্ষা দেয়া হয়। এগুলো মোটেই জ্ঞানচর্চা নয়, কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এখানে true sense এর কোনো রিসার্চ হয় না। বরং ছেলেদের হাতে এভাবে ভুল পন্থায় কিছু রেফারেন্স তুল দিয়ে তাদেরকে জ্ঞানী ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া হয়। এতে প্রেজুডিস তৈরী হয়, এবং নিরপেক্ষ উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

আবার, ইসলামী কর্মকাণ্ড করার জন্য দল পদ্ধতি আবিষ্কার করা, তারপর নিজেরাই সেই দলের বিভিন্ন নিয়ম-নীতি তৈরী করা (শিবিরের অন্তর্ভুক্ত থাকতে হলে ছাত্র হতে হবে), এবং নিজেরাই সেগুলোকে বাইপাস করার জন্য পদ্ধতি বের করা (সবসময় কোনো না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নামকাওয়াস্তে ছাত্র হয়ে থাকা) – এগুলো ঘটছে। এটা ঘটবেই, কারণ এত সব সমস্যার গোড়া এক জায়গায় – আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) জ্ঞানের উপর আস্থা না থাকা, ইসলামের পরিপূর্ণতার অর্থ না বোঝা, নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করে দল পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। যেগুলো আমি উল্লেখ করলাম, এসব সমস্যা হলো সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের অল্প কিছু সমস্যা। সকল সমস্যার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। কেউ যদি সমস্যার গোড়ায় দৃষ্টিপাত করে, তখন সে আর সবকিছু এমনিই বুঝতে পারবে।

জামায়াতের নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে দেবতুল্য ভক্তি ও আনুগত্যের আবহাওয়া সৃষ্টি করা হয়েছে গোটা সংগঠনে। অথচ জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ইন্টারনাল পলিটিক্সের ইতিহাস যারা জানেন, সেই "our little dirty secrets” যারা জানেন, তারা স্পষ্ট বুঝতে পারেন যে, আসলেই দ্বীনি নেতৃত্বের যোগ্যতা তাদের আছে কিনা।

বিভিন্ন স্তরের ধর্মীয় মান তথা কর্মী, সাথী, সদস্য – ইত্যাদির কোনো কনসেপ্ট আল্লাহর রাসূল (সা.) দিয়ে যাননি। জামায়াত-শিবিরের প্রতিষ্ঠার পর প্রাথমিক অবস্থায় আপাতঃ দৃষ্টিতে এগুলোর কিছু ভালো ফলাফল দেখা গেলেও পরম জ্ঞানী আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর নবী মহামানব মুহাম্মদ (সা.) এর চেয়ে আগ বাড়িয়ে করা এই কাজের নোংরা ও ক্ষতিকর দিকটি পরবর্তীতে প্রকাশিত হলো। বিভিন্ন ধর্মীয় মান, সাথী, সদস্য ইত্যাদি পদবী দেয়ার মাধ্যমে একজন মানুষকের নিজের তাকওয়া সম্পর্কে উচ্চ ধারণা লাভ করার সুযোগ হয়, যা সুস্পষ্ট রিয়া। প্রথম স্তর কর্মী, দ্বিতীয় স্তর সাথী এবং তৃতীয় ও সর্বোচ্চ স্তর (মান) হলো সদস্য। প্রতিটা নিচের স্তরের কাছেই উপরের স্তর সম্পর্কে উচ্চ ধারণা দেয়া হয়, উপরের স্তরের ব্যক্তি হিসেবে তাদের তাকওয়া, আমল-আখলাক ইত্যাদির প্রশংসা করা হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই একজন "সাথী” মনে করে যে, “সদস্য” হওয়া মানেই ঐ লেভেলের তাক্বওয়া অর্জন করা, ঐরকম উন্নত আমল-আখলাকের অধিকারী হওয়া। এরপর সে নিজে যখন সদস্য হয়, তখন তার মধ্যে ঐ অনুভূতি কাজ করে, তৃপ্তি বোধ হয়। আর নিজের আমল-আখলাকের ব্যাপারে তৃপ্তি হলো বড় ধরণের রিয়া, আল্লাহর বিরুদ্ধে একপ্রকার বিদ্রোহ। যাহোক, সেটা তাযকিয়ায়ে নফস (আত্মশুদ্ধি) টপিকের আলোচ্য বিষয়।

সেক্যুলার সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়ে একজন দ্বীনি ব্যক্তিত্ব কিভাবে সেক্যুলার সংবিধান রক্ষার শপথ করতে পারেন? কুরআনের সংগ্রামই হলো সেক্যূলার যত (সং)বিধানের বিরুদ্ধে, আর সেই কুরআনের দায়ী, কুরআনের অনুসারী হয়ে কিভাবে কুরআন-বিরোধী সংবিধান রক্ষার শপথ করতে পারেন একজন আলেম? আবারও সেই একই দলীয় স্বার্থে, আর দল ইসলামের স্বার্থে, ইত্যাদি অপযুক্তির (Fallacy) আশ্রয় নিয়ে এসব কর্মকাণ্ডকে জাস্টিফাই করা হয়। আল্লাহর রাসূলের (সা.) ক্ষেত্রে কি আমরা অনুরূপ কাজ কল্পনা করতে পারি?

এখন, এইরকম একটি দল যখন ইসলামের partial representation দ্বারা, কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ ও বিকৃত ব্যাখ্যা দ্বারা অনুপ্রাণিত করে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তখন সেই মৃত্যু শহীদি মৃত্যু কিনা, সে সিদ্ধান্তের ভার আল্লাহর উপরই ছেড়ে দেয়া ভালো। কারণ জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন করতে গিয়ে যারা মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন, তাঁদের নিয়ত, তাঁদের কর্মসহ আল্লাহ তা'আলা যত factor বিবেচনা করে বিচার করবেন, তার সকল ফ্যাক্টর আমাদের জ্ঞানে নেই। আর এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণও নয় যে, তাঁরা শহীদের মর্যাদা পেলেন, নাকি অন্যায়কারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হলেন। আমরা তাঁদের নিষ্ঠাকে সম্মান করতে পারি, কিন্তু ভুল কর্ম বা পন্থাকে সমর্থন করতে পারি না। আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, এই দলীয় পদ্ধতিটি বৈধ কিনা, উপযুক্ত কিনা, এবং এদের কর্মকাণ্ড সঠিক কিনা, সঠিক হলে কতটুকু সঠিক, ভুল হলে কতটুকু ভুল। এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক পন্থায় ইসলামী জ্ঞান অর্জন করা।

কারণ, ধরে ধরে অন্ধকার দূর করার পদ্ধতি ইসলামের নয়। আলো আসলে অন্ধকার দূরীভূত হয়, এটাই ইসলামের পন্থা। হ্যাঁ, কেউ যদি প্রকৃত ইসলামের প্রচার-প্রসার করতে যায়, তখন ময়দান বিশ্লেষণের নিমিত্তেই এসব তার জানা প্রয়োজন। সেটা শুধু জামায়াত-শিবির নয়, দেশের ইসলাম নিয়ে কাজ করা ভালো-মন্দ-ভণ্ড সব গ্রুপের সম্পর্কেই ধারণা নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু জামায়াত-শিবির কিংবা অন্য কোনো দল / মতের বিশাল কর্মযজ্ঞ ও ইসলাম থেকে বিচ্যুত নীতি ইত্যাদি দেখে যদি কেউ মনে করেন যে এগুলো জনসমক্ষে উন্মোচন করে জনগণকে সচেতন করাটাই সমাধান, তবে তা সঠিক নয়। কারণ তখন হয়তো কেউ কেউ জামায়াত-শিবির থেকে বের হয়ে আসবে, কিন্তু তারপর তারা অনুরূপ কিংবা আরো বেশি ভুল-ভ্রান্তি মিশ্রিত কোনো গ্রুপের পাল্লায় পড়বে। এছাড়াও যেহেতু এই সংগঠন ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের ব্যাপারে তাদের মাঝে তীব্র ধর্মীয় আবেগ কাজ করে, সেহেতু যৌক্তিকভাবে তাদের অসঙ্গতি ও ইসলামবিরোধী পদ্ধতি / কর্ম ইত্যাদি তুলে ধরলেও সেটা তারা মেনে নিতে পারবেন না, বরং দলকে আরো বেশি আঁকড়ে ধরবেন, আর যৌক্তিকভাবে দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা ব্যক্তিটির প্রতি বিরূপ হয়ে যাবেন। এটা শুধু জামায়াত-শিবিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না, বরং এটা একটা সাধারণ নীতি, যা সকল মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদিও ভ্রান্ত নীতির উপর ভিত্তি করে ইসলামী দল প্রতিষ্ঠা করে নানান ইসলামী নীতি-বিচ্যুত ও ইসলামবিরোধী কাজ জামায়াত-শিবিরের হাত ধরে ঘটছে, এবং যদিও এইসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশে প্রকৃত ইসলামের প্রচার-প্রসারের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছেন, তবুও জনসমক্ষে তাদের একেবারে ভিতরের dirty secrets তুলে ধরাটা সঠিক পন্থা নয়।

বরং সঠিক পন্থা হলো জ্ঞান-গবেষণার মাধ্যমে অতি সতর্কতার সাথে ইসলামের সঠিক পন্থাটি জেনে নেয়া। নয়তো আরো কারো হাত ধরে নিষ্ঠার সাথে দল পদ্ধতির মতো আরো কোনো ক্ষতিকর পদ্ধতি বের হয়ে আসবে, যেই বিষবৃক্ষের ফল আরো পরে সমাজে প্রকাশিত হবে। তাই আমি মনে করি, ইসলামের পবিত্র পতাকা স্পর্শ করার আগে, ইসলামের torch bearer হওয়ার আগে আত্মশুদ্ধি করা প্রয়োজন, এবং জ্ঞান অর্জনের সঠিক পদ্ধতিতে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে প্রতিটা স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিংসহ দ্বীনি নেতৃত্বের ন্যুনতম যোগ্যতার জ্ঞানগত স্তরে পৌঁছানো প্রয়োজন। অতঃপর কেউ যদি নিজের অন্তরে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুভব করে যে, এটা আল্লাহরই ইচ্ছা তিনি ইসলামের পতাকাবাহী হবেন, তখন জনগণের মাঝে বেরিয়ে পড়া উচিত এবং দ্বীনের কাজ করা উচিত। লক্ষ্য রাখা উচিত, মানবজাতির ইতিহাসে আল্লাহ তায়ালা ইসলামের পবিত্র পতাকা বহনের জন্য নিষ্পাপ ও নির্ভুল মানুষদেরকেই (নবী-রাসূলগণ (.)) নির্বাচন করেছেন। বরং নিষ্পাপত্ব হলো নবুওয়্যাতের একটি অপরিহার্য গুণ। নিষ্পাপ নবী-রাসূলগণের হাতে ইসলামের পতাকা নিরাপদ ছিলো। তাঁদের জ্ঞানগত কিংবা আচরণগত দোষত্রুটির কারণে ইসলামের কোনো ক্ষতি হতো না, ক্ষতি হয়নি। লক্ষ্যনীয় যে, যদিও নবী-রাসূলগণের (.) বেশিরভাগই জীবনের একটা নির্দিষ্ট বয়সে আল্লাহর সুস্পষ্ট আদেশ পাওয়ার পরেই ইসলামের পতাকা হাতে বেরিয়ে পড়েছেন। অথচ তাঁরা জন্মের পর থেকেই নিষ্পাপ জীবন যাপন করেছেন, এবং আচরণগত ত্রুটির আশঙ্কা তাঁদের ছিলো না। তবুও তখনই কেবল ইসলামের পতাকা হাতে বেরিয়ে পড়েছেন, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট আদেশ পেয়েছেন। মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁদের হাতেই ইসলামের পবিত্র পতাকাকে ন্যস্ত করেছেন, entrust করেছেন, যাঁদের হাতে ইসলামের ক্ষতি হবার কোনোই আশঙ্কা ছিলো না। অনুরূপভাবে নবীর অবর্তমানে তাঁরাই ইসলামের পতাকা বহন করার যোগ্য ব্যক্তি, যাঁরা নিজেদের জ্ঞানগত যোগ্যতার ব্যাপারে দৃঢ় নিশ্চয়তা লাভ করেছেন, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নিজের অন্তরে ইসলাম প্রচারের আধ্যাত্মিক আদেশ অনুভব করেছেন। আর নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ তা'আলা এমন কোনো ব্যক্তির অন্তরে ইসলাম প্রচারের জন্য আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা দান করবেন না, যে ব্যক্তির হাতে ইসলামের পতাকা অনিরাপদ। আর আল্লাহ তা'আলা যদি কারো অন্তরে সেই আদেশ দান করেন, সেই ব্যক্তি ইসলামের পতাকা বহনের দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতিও জানাবে না, বরং নবীর মত করেই জনগণের মাঝে সর্বোত্তম আখলাক, জ্ঞান, যোগ্যতা ও কর্মপন্থাসহকারে ইসলাম প্রচার করে যাবেন।
তবে ইসলামের দায়ী (দাওয়াত দানকারী) হবার পূর্বশর্ত হিসেবে আমি যে পূর্ণ জ্ঞানগত যোগ্যতা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে আধ্যাত্মিক আদেশের কথা বললাম, সে বিষয়ে অনেকেই দ্বিমত করবেন। এটি আলাদা আলোচনার বিষয়।

অথচ এখন চারিদিকে তাকিয়ে দেখলে আশঙ্কার সাথে লক্ষ্য করতে হয়, ইসলামের পতাকা যারা হাতে তুলে নিয়েছেন, তাদের প্রায় কারো হাতেই ইসলাম নিরাপদ নয়। কি সেটা জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, কি সেটা দেশের বিভিন্ন পীরপন্থী গ্রুপ, কি আল-কায়েদা-হিজবুত তাহরির-ISIS, কিংবা কোনো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় লেকচারার। এই মানুষেরা কেউ কেউ জেনেশুনে ইসলামের ক্ষতি করছেন, আর কেউবা না জেনেই নিষ্ঠা সহকারে ইসলামের ক্ষতি করে যাচ্ছেন। কারো হয়তো আমল-আখলাকের কোনো সমস্যা ছিলো না, এবং নিষ্ঠা ছিলো পরিপূর্ণ, কিন্তু পূর্ণ জ্ঞানগত যোগ্যতা না থাকার ফলে সেই পূর্ণ নিষ্ঠা সহকারেই ইসলামী দল প্রতিষ্ঠা করেছেন, অথচ যা আসলে ইসলামের জন্য ক্ষতিকর। আর সেইসব ইসলাম-প্রচারকের কথা তো বাদই দিলাম, যাদের দোষত্রুটি সাধারণ মানুষের চোখেই ধরা পড়ে, হোক সেটা আখলাকের ত্রুটি, কিংবা জ্ঞানগত ত্রুটি। চার বছর যারা ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রিতে পড়ে অনার্স পাশ করেন, তাদেরকে যদি বলা হয় ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রির উপর ক্লাস নিতে, তখন অধিকাংশ ছাত্রই না করবে, কারণ তারা শিক্ষকতার জন্য নিজেদের জ্ঞানগত যোগ্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত নয়; অথচ ইসলামের ব্যাপারে কত সহজেই না চারিদিকে যেকোনো মানুষ মন্তব্য করে যাচ্ছে, এমনি ইসলাম-প্রচারকও হয়ে বসছে!

জামায়াত শিবিরকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, তাই তাদের সমস্যাগুলো ভালোভাবে জানি। তবে সবসময় এটা লক্ষ্য রাখা উচিত যে, একটি দলের দোষত্রুটির দিকে মনোযোগ এত বেশি যেনো হয়ে না যায়, যেটা আমাদেরকে ইসলামের সার্বিক চিত্র, bigger picture থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে। জামায়াত শিবির ইসলামের নামে একটি ছোট দল মাত্র। ইসলামের নামে দুনিয়াব্যাপী নামে বেনামে অসংখ্য দল ও মতাদর্শ আছে। ভালো-মন্দের মিশেল এই সকল দল / মতাদর্শ থেকে আমরা তখনই প্রকৃত ইসলামকে আলাদা করতে পারবো, যখন নিরপেক্ষভাবে সঠিক পদ্ধতিতে ইসলামকে জানবো এবং জ্ঞান অর্জন করবো। এবং সে ধরণের একটি নিরপেক্ষ মন নিয়ে জ্ঞানার্জনে অগ্রসর হতে হলে নিজেকে সবধরণের চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে দূরে সরিয়ে আপন মনে চিন্তা করতে হবে। নয়তো দেখা যাবে যে, শুরুতেই আমার চিন্তাধারা কোনো একটি বিশেষ মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যাত্রা শুরু করবে। অতঃপর গোড়াতে এক ডিগ্রি বাঁকা একটি লাইন দীর্ঘ পথ চলার পর চোখে পড়বে যে, তা সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে কত দূরে‍!

ইমাম হাসানুল বান্না, সাইয়্যেদ কুতুব শহীদসহ সমসাময়িক বিভিন্ন স্কলারের লেখা, জীবনেতিহাস ইত্যাদি জামায়াত-শিবিরের জনশক্তিকে পড়ানো হয়, অথচ এমনকি একটি সফল ইসলামী বিপ্লবের নেতা হিসেবে তাঁদেরই সমসাময়িক ইমাম খোমেনীর (রহ.) নামও উচ্চারিত হয় না কোথাও। পরবর্তীতে আমি বুঝতে পারলাম যে, ইমাম খোমেনী (রহ.) যেহেতু দলীয় পদ্ধতিতে কাজ করেননি, (বরং তিনি আল্লাহ রাসূলের অনুসৃত পন্থায় দ্বীনের কাজ করে গিয়েছেন, এবং সফলও হয়েছেন) সেহেতু তাঁর জীবনেতিহাস নিজেদের জনশক্তিকে পড়তে দিলে এতে দল পদ্ধতির অসারতা সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে, যা স্বয়ং দলীয় অস্তিত্বের প্রতি হুমকি। একারণেই না সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের সমসাময়িক স্কলার হিসেবে ইমাম খোমেনীকে তারা চেনে, আর না ইরানের বিপ্লবের ইতিহাস তাদেরকে জানতে দেয়া হয়। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মিশর, তিউনিশিয়া, তুরস্ক ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস তাদেরকে পড়ানো হয়। কিন্তু একটি সফল ইসলামী বিপ্লব, সেই বিপ্লবের আধ্যাত্মিক নেতা ও একটি সফল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে simply এড়িয়ে যাওয়া হয় এমনভাবে যে, as if they don't exist ! আমি বুঝতে পেরেছি যে, এটা কেবলমাত্র একারণেই করা হয় যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে গভীরভাবে স্টাডি করলে সেটা যে দলীয় পদ্ধতির চেয়ে উন্নত পদ্ধতি (এবং আল্লাহ রাসূলের (সা.) অনুসৃত পদ্ধতি), তা জনশক্তির কাছে প্রকাশ হয়ে পড়লে দলের মাঝে সংস্কার আনতেই হবে, নয়তো নেতৃত্বে টিকে থাকাই মুশকিল হবে। একটি সত্যিকারের রিসার্চ সেন্টার (এবং যারা সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী নেতৃত্বও বটে) থাকলে সেখানে পেশ করা যেতো, কিন্তু তা-ও এখানে নেই।

সেক্যুলার গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলাম কায়েম প্রসঙ্গে

সেক্যুলার ডেমোক্রেসির ইতিহাস খুবই নতুন, মাত্র চারশো বছরের। ওয়েস্টফালিয়া ট্রিটির মাধ্যমে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক করার কাজ শুরু হয়েছিলো, এবং এরপর যখন পশ্চিমারা ও ইউরোপিয়ানরা বিশ্বে আধিপত্যশীল হয়ে গেলো, তখন ইসলামপন্থীরা তাদের কাউন্টার করার জন্য তাদেরই পন্থা গ্রহণ করলো। তারাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গঠন করলো, যার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংসদের যাবার চেষ্টা করা হলো। অথচ দ্বীন হিসেবে ইসলামের পরিপূর্ণতার উপর যারা আস্থাশীল, তারা না দ্বীনের প্রচারের জন্য দল কনসেপ্টকে গ্রহণ করবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) তা করেননি, আর না তারা রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েমের জন্য দলের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) তা করেননি। এমনকি যদি এসব কাজে সাময়িক ভালো ফলাফল দেখা যায়ও, তবুও দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণতার উপর আস্থাশীল ব্যক্তি এই যুক্তিতে এসব কাজকে পরিহার করবে যে, নবী কর্তৃক বাস্তবায়িত ইসলামের কর্মপন্থা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহর জ্ঞানকে অতিক্রম করে নতুন কোনো কনসেপ্ট ব্যবহার করে তাঁরই ধর্ম ইসলামের কাজ করাটা বড় ধরণের ধৃষ্টতা ও বোকামি।

আর সেই কাজ করতে গিয়ে প্রতিটা ইসলামী দলের ইতিহাসেই অনেক সুস্পষ্ট ভুল হয়েছে, এখনও হচ্ছে, এবং নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ভবিষ্যতেও হবে। অতি সম্প্রতি দেখলাম রনি এমপি জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে একটা আর্টিকেল লিখেছে (২রা জানুয়ারি, সম্ভবতঃ বাংলাদেশ প্রতিদিনে)। প্রথম থেকেই রনি এমপি জামাতের নেতাদের সাথে জেলে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে আবেগী লেখা লিখে জামায়াত-শিবিরের মাঝে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরীর অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিলো। এরপর যখন জামায়াত-শিবিরের ছেলেরা নিজেরাই তাকে নিজেদের মাঝে একটা প্ল্যাটফর্মে তুলে দিলো, তখন সে final blow দিলো। রাজনীতির স্বার্থেই রনি এমপির বিরোধিতা তারা করেনি, যখন সে পক্ষে লিখেছে। অথচ জামায়াত নেতাদের প্রশংসা করে লেখা রনি এমপির প্রথম আর্টিকেল পাবলিশ হবার পরে একজন প্রকৃত ধর্মীয় নেতৃত্ব হলে জনগণকে সচেতন করে দিতেন যে, দেখো, এই লোক ধুরন্ধর, সে তোমাদর মাঝে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, সে কিন্তু আসলে আমাদের পক্ষের লোক নয়।
কিন্তু রাজনীতির কারণেই সেই কাজ করতে পারেনি। শফিক রেহমানের কথাই বলি। এই লোকটি ইসলামের বড় ধরণের শত্রু, বাংলাদেশে বহু আগে থেকেই সে পশ্চিমা নোংরা সংস্কৃতির importer। কিন্তু সে বিএনপি-জামায়াত জোটের রাজনৈতিক বিবেচনায় বন্ধু। এখন জামায়াত-শিবির "ইসলামী" দল হলেও শফিক রেহমানের মত লোকের গ্রহণযোগ্যতা তাদের মাঝে তৈরী হয়ে গেলো; ধর্মীয় কারণে নয়, রাজনৈতিক কারণে। একারণেই জামায়াত শিবিরের কোনো নেতাই কখনো শফিক রেহমানের ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করেনি যে, এই লোকটি নোংরা অপসংস্কৃতির importer, এর ব্যাপারে সাবধান থাকুন। অথচ শফিক রেহমানের import করা এসব অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তখন তারা কিছু করতেও পারবে না, যখন ২০ দলীয় জোট ক্ষমতায় যাবে, আর শফিক রেহমান থাকবেন খালেদা জিয়ার অন্যতম উপদেষ্টা।
সেক্যুলার ডেমোক্রেসিতে রাজনীতির স্বার্থে অনেক কিছুই করতে হয়। ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতি পৃথক নয়, জামায়াত-শিবিরই সেটা বলে থাকে, কিন্তু (সেক্যুলার) "রাজনীতির স্বার্থে” ইসলাম বিসর্জন দেয়াটাও ইসলামে নেই।

একবার দেখলাম হরতালে, সেটা সম্ভবত কোনো যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ার হরতাল, সেই হরতালে অ্যামেরিকান এম্ব্যাসির গাড়ি ভাংচুর হলো। সাথে সাথে জামায়াতের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়া হলো। সেক্যুলার রাজনীতির ময়দানে নামলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভু মানতেই হবে, তাদের গাড়ি ভাঙলে দুঃখ প্রকাশ করতেই হবে। অথচ যদিও সেটার কোনো প্রমাণ ছিলো না! আর এখন জনগণের অসংখ্য গাড়ি ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও করলেও দুঃখ প্রকাশ করা হয় না! এগুলি তো ইসলাম নয়!

কট্টর ইসলামবিদ্বেষী হিন্দু নেতা নরেন্দ্র মোদী নির্বাচিত হবার পর জামায়াতের পক্ষ থেকে সবার আগে অভিনন্দন জানানো হলো। অথচ জামায়াত তখন এমনকি বিরোধী দলও নয়, সংসদে তাদের কোনো আসনও নেই যে, diplomatic obligation হিসেবে কাজটি করতে হবে। কিন্তু "ভবিষ্যত রাজনীতির স্বার্থে" কট্টর ইসলামবিদ্বেষী মুসলিম হত্যাকারী হিন্দু নেতাকেও অভিনন্দন জানানো জায়েজ। কারণ এটা "দলের স্বার্থে”, আর দল ইসলামের স্বার্থে।

প্রথমতঃ, সেক্যুলার ডেমোক্রেসির যে মানদণ্ড পশ্চিমা বিশ্ব সেট করেছে, তা ইসলামের মানদণ্ড নয়। দ্বিতীয়তঃ, দল পদ্ধতি হলো ইসলাম প্রচার-প্রসারের যে মূল কনসেপ্ট, তা থেকে এক প্রকার বিচ্যুতি। এরপর এই দলীয় স্বার্থে ও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতির স্বার্থে এত বেশি বিষয়ে ছাড় দিতে হয় ও হয়েছে যে, তা সুস্পষ্ট ইসলামের লঙ্ঘন। শুরুতে ১ ডিগ্রি বাঁকা একটি পথকে প্রথমে সিরাতুল মুস্তাকিমের থেকে আলাদা বলে মনে হয় না, কিন্তু সেই পথ যখন অনেক দূর এগিয়ে যায়, এক ডিগ্রি হেলানো ভিত্তির উপর যখন ১০০ তলা বাড়ি তৈরী করা হয়, তখন সেই হেলে পড়া বাড়ি স্পষ্ট দেখা যায়, সেই পথ যে সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে কতটা দূরে, তা সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

প্রতিবাদ করার কি কেউ নেই?

এতসব সমস্যা দেখা ও বোঝা সত্ত্বেও অনেকে প্রতিবাদ করছেন না। যেহেতু এটা ইসলামের ব্যাপার, সেহেতু ইসলামের পতাকা বহনের সেই জ্ঞানগত যোগ্যতা ও আল্লাহ কর্তৃক আধ্যাত্মিকভাবে আদিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কারোরই উচিত না ইসলামের পতাকা বহন করা। তবে ভুল-ত্রুটি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য সঠিক পদ্ধতিতে ইসলামের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। এতে নিজেকেও রক্ষা করা যায়, নিজের পরিবারকেও রক্ষা করা যায়।

তবে আশার কথা হলো, ইন্টারনেটের যুগে বাস করছি আমরা। এখানে মানুষের প্রাইভেসি বলে আর কিছু থাকছে না। তেমনি দলীয় প্রাইভেসি বলেও আর কিছু থাকছে না। অতি সম্প্রতি দেখছি যে শিবির ত্যাগী কিছু ছেলের হাত দিয়ে ফেইসবুকে "inner dirty secrets” বের হয়ে আসছে। মানুষের অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশান যত বাড়বে, ততই এটা ব্যাপকহারে ঘটতে থাকবে। তখন বিশুদ্ধ হওয়া ও নিজেদের সংস্কার করা ছাড়া উপায় থাকবে না। ইন্টারনেট হলো পরবর্তী বিপ্লবের হাতিয়ার। এর সম্ভাবনা ও আশঙ্কা, উভয়ই অনেক। যেমন :
. ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন দল / মতের ভুল-ভ্রান্তিগুলো জানতে পারবে।
. ইন্টারনেটের মাধ্যমেই আবার বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণার দল / মতের প্রচার-প্রসার ঘটবে।
. ইন্টারনেটের মাধ্যমেই মানুষ সঠিক পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে জানতে পারবে, এবং প্রকৃত ইসলামের সাথে পরিচিত হতে পারবে। কারণ এতদিনের চুপ করে থাকা মানুষেরা, যারা পত্র-পত্রিকা ম্যাগাজিন ইত্যাদি কোনো প্ল্যাটফর্মেই জানা সত্ত্বেও প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে পারছিলেন না, তারা এই information highway তে সঠিক information গুলো put করবেন। এবং ইসলামের সেই সঠিক বিষয়গুলো ইন্টারনেটে ভেসে বেড়াবে অনন্তকাল, আর কখন কোনো এক সম্ভাবনাময় বিপ্লবী ব্যক্তি সেই জ্ঞানের সংস্পর্শে এসে সত্যিকারের সংস্কার সাধন করবেন, তা কে জানে? অতএব, এটা খুবই আশার কথা। ইন্টারনেটের জগতে আর চাইলেই মানুষকে সংকীর্ণ সিলেবাসের মধ্যে কিংবা কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ বা বিকৃত ব্যাখ্যার মধ্যে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। ইন্টারনেটের জগতে সকল ধরণের মতের সংস্পর্শে মানুষ আসবেই, এবং আসছেও। অর্থাৎ, একটি রিসার্চ যে প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয় আরকি। ইন্টারনেটের কারণে এখন মানুষ পড়ছে, শুনছে, জানছে এবং নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে যাচাই করছে। ফলস্বরূপ, in the long run তারাই টিকে থাকবে, তাদেরই গণভিত্তি তৈরী হবে ও দৃঢ় হবে, যারা প্রকৃত সত্যের সাথে আছে। এতদিন ধরে ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা না করলেও, জ্ঞানগত বিপ্লব থেকে দূরে থাকলেও ইন্টারনেটের জগতে জ্ঞানের মুখোমুখি হয়ে পড়ছে বিভিন্ন দল-মতের লোকেরা। আর সত্যিকারের জ্ঞানগত ভিত্তি না থাকলে তখন তারা টিকে থাকতে পারবে না। অর্থাৎ, একটি জ্ঞানগত বিপ্লব imminent (অত্যাসন্ন)। এবং সেটা এই ইন্টারনেটের মাধ্যমেই হবে। ইন্টারনেট একটি নতুন প্রযুক্তি। আর খুব দ্রুতই তা সব মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। Data collection, data aggregation ইত্যাদি করে যাচ্ছে গুগল ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সংস্থা। ডাটা মাইনিং, বিগ ডাটা, ইত্যাদি নিয়ে যেসব কাজ হচ্ছে, কে বলতে পারে যে সেটা ইসলামের সাহায্যে কাজে আসবে না? প্রতিনিয়ত ইসলামের বিষয়ে অসংখ্য সার্চ হয় গুগলে। কে বলতে পারে যে এই সার্চের মাধ্যমে সঠিক তথ্য কারো হাতে পৌঁছাবে না? কারণ ইসলামের শত্রুরা যেমন কাজ করে যাচ্ছে ইন্টারনেটে, তেমনি ইসলামের সম্পর্কে কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর মানুষেরাও কাজ করে যাচ্ছেন ইন্টারনেটে, তেমনি কাজ করে যাচ্ছেন জামায়াত-শিবিরের মত দলগুলো। না চাইতেও সবাই যেনো এক জ্ঞানগত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এবং এই জ্ঞানগত যুদ্ধ দিনদিন প্রকট আকার ধারণ করবে। তখন সত্যের বিজয় হবেই। আমি এ ব্যাপারে খুবই আশাবাদী।


. কমন গ্রাউন্ড (1st authority : universal authority : authority of reason). Agnosticism / Skepticism. Fallacy. First cause ( স্রষ্টাতত্ত্ব / সৃষ্টিতত্ত্ব). স্রষ্টার অপরিহার্য গুণাবলী
. ঐশী গ্রন্থের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য (2nd authority : কুরআন). নবী চেনার উপায়, নবীর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য (3rd authority : সুন্নাহ). তাকদির / কার্যকারণবিধি (আল্লাহ সব জানলে পৃথিবীর ভবিষ্যত সব ঘটনা পূর্বনিধারিত কিনা). লিখিত কুরআন ও লিখিত হাদীসের স্ট্যাটাসগত পার্থক্য
১০. ধর্মীয় বিষয়ের authority-র পর্যায়ক্রম : (আক্বল, কুরআন, সুন্নাহ (মুতাওয়াতির হাদীস), ইজমা-এ উম্মাহ)
১১. সতর্কতার কর্মনীতি (rule of precaution)




পরিশিষ্ট – ২ : Levels of guidance


মানুষের দুনিয়ার জীবনটা হলো উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এক অবস্থা। দুনিয়ার যাত্রা শেষ হলে সে আবার তার উৎসের কাছে ফিরে যাবে। দুনিয়ার এই জার্নিটা যেনো আমরা সঠিকভাবে পার করতে পারি, সেজন্যে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন স্তরের গাইডেন্স দান করেছেন। একটা দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টাকে এভাবে দেখা যেতে পারে :
মৌলিক / সর্বজনীন স্তরের গাইডেন্স : এই গাইডেন্স সকল মানুষের মাঝে সহজাত। যে কেউ এই গাইডেন্সকে অনুসরণ করবে ও সৎকর্ম করবে, পরকালে সে মুক্তি পাবে, তার কোনো ভয় থাকবে না (:৬২)। আর সর্বজনীন এই গাইডেন্স হলো তাওহীদ ও আখিরাতের অনুভুতি, এবং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি। কোনো মানুষ ইসলামের সাথে পরিচিত না হলেও সে যদি শুধু এই চারটি অনুভুতিকে যথাযথভাবে অনুসরণ করে পথ চলে, তবে সেটাই তাকে পরকালে উৎরে দেবে। এটা আল্লাহরই ওয়াদা। তাওহীদ ও আখিরাতের অনুভূতি এবং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি – এই চারটি বিষয় যে সকল মানুষের মাঝে সর্বজনীন, সহজাত – কুরআনে সেকথার প্রমাণও বিদ্যমান।


[বিবেক [৭৫:(নফসে লাওয়ামা), ৯১:(তাক্বওয়া)], বিচারবুদ্ধি (আক্বল ৮:২২), স্রষ্টার ব্যাপারে স্পিরিচুয়াল ইনস্পিরেশান (৪১:৫৩)]


কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম দয়ার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মানুষের এই যাত্রাকে সহজ করতে আরো তিনটি স্তরের গাইডেন্স দান করেছেন। পরবর্তী এই তিনটি স্তরের মাঝে যে ব্যক্তি যত বেশি স্তরে পৌঁছতে পারবে, তার সিরাতুল মুস্তাকিমে চলা ততই সহজ হবে। আর এই তিনটি স্তর হলো :
. ঐশী কিতাব (আমাদের জন্য কুরআন মজীদ)
. রিসালাত (আমাদের জন্য মুহাম্মদ (সা.))
. ইমামত (ইমাম আলী (.) হতে ইমাম মাহদী (.) পর্যন্ত ১২ ইমাম)


কোনো ধর্মেরই অনুসারী নয়, এমন ব্যক্তি গাইডেন্স এর মৌলিক স্তরে রয়েছে।
ইসলাম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইহুদী ধর্মের অনুসারীরা পরবর্তী তিনটি স্তরের মাঝে দুটি স্তরের গাইডেন্স পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে :
ঐশী কিতাব (ইহুদিদের তওরাত, খ্রিষ্টানদের ইঞ্জিল, মুসলমানদের কুরআন)
ও রিসালাত (ইহুদিদের মূসা (.), খ্রিষ্টানদের ঈসা (.), মুসলমানদের মুহাম্মদ (সা.))

আর সর্বশেষ স্তরের গাইডেন্স, ইমামত পর্যন্ত যারা পৌঁছাতে পেরেছে, মুসলমানদের মাঝে তারা শিয়া বা আহলে বাইতের অনুসারী বলে পরিচিত।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

টাকার ইতিহাস, মানি মেকানিজম ও ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের মহা জুলুম

(লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।) **জালিমের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম**

জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাস হলো মহররম মাস।
জালিমের মুখোশ উন্মোচনের মাস মহররম।
জুলুমের কূটকৌশল উন্মোচনের মাস মহররম।
আধুনিক সেকুলার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় লেজিসলেশান (সংসদ), আর্মড ফোর্সেস (আর্মি) ও জুডিশিয়ারি (আদালত) হলো এক মহা জুলুমের ছদ্মবেশী তিন যন্ত্র, যারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে জুলুম টিকিয়ে রাখার জন্য।
তারচেয়েও বড় জালিম হলো big corporations: বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, যারা তাবৎ দুনিয়াকে দাস বানিয়ে রেখেছে।
আর এই দাসত্বের শৃঙ্খলে তারা আমাদেরকে আবদ্ধ করেছে ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের মাধ্যমে:
টাকা আমাদের শ্রমকে ধারণ করে, অথচ সেই টাকার মূল্য আপ-ডাউন করায় অন্যরা -- ব্যাংক ব্যবসায়ীরা!
টাকা আমাদের শ্রমকে সঞ্চয় করার মাধ্যম,
অথচ সেই টাকা আমরা প্রিন্ট করি না, প্রিন্ট করে (ব্যাংকের আড়ালে) কিছু ব্যবসায়ী! সেই টাকার মান কমে যাওয়া (বা বেড়ে যাওয়া) আমরা নির্ধারণ করি না -- নির্ধারণ করে ব্যাঙ্ক (ব্যবসায়ীরা)!
ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রতিবাদী চেতনাকে ধারণ করব, শোকাহত হব কারবালার স্মরণে, অভিশাপ দেব জালি…

ধর্মব্যবসা: মুসলমানদের হাতে ইসলাম ধ্বংসের অতীত-বর্তমান (১)

ভূমিকা যদিও পলিটিকাল-রিলিজিয়াস ইস্যুতে নিশ্ছিদ্র আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করে আলোচনা করার অভ্যাস আমার, কিন্তু এখানে বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরে আর্গুমেন্ট করার প্রথমতঃ ইচ্ছা নেই, দ্বিতীয়তঃ সময় ও সুযোগ নেই। আমি যা সত্য বলে জানি, তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। যারা আমার উপর আস্থা রাখেন তাদের জন্য এই লেখাটি সোর্স অব ইনফরমেশান, উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষদের জন্য সত্য অনুসন্ধানের নতুন কিছু টপিক, আর প্রেজুডিসড ধর্মান্ধ রোগগ্রস্ত অন্তরের জন্য রোগ বৃদ্ধির উছিলা। শেষ পর্যন্ত আর্গুমেন্ট ও ডায়লগের দুয়ার উন্মুক্ত রাখার পক্ষপাতী আমি, কিন্তু সেই আর্গুমেন্ট অবশ্যই সত্য উন্মোচনের নিয়তে হওয়া উচিত, নিজের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস ও ধ্যান ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করবার উদ্দেশ্যে নয়। মক্কা-মদীনা: মুহাম্মদ (সা.) থেকে আলে-সৌদ (৬২৯-১৯২৪) এদেশের অধিকাংশ মানুষ মক্কা-মদীনার ইতিহাস কেবল এতটুকু জানেন যে, মুহাম্মদ (সা.) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন। কিন্তু প্রায় চৌদ্দশ’ বছর আগে মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র থেকে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরবের ইতিহাস কম মানুষই জানেন। পবিত্র ম…

পিস টিভি, জাকির নায়েক ও এজিদ প্রসঙ্গ

সম্প্রতি গুলশান হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। আমি তখন দিল্লীতে ছিলাম। দেশে ফিরে শুনি পিস টিভি ব্যান করা হয়েছে বাংলাদেশে, এবং তার আগে ইন্ডিয়াতে।

আমার বাসায় টিভি নেই, এবং আমি জাকির নায়েকের লেকচার শুনিও না। কিংবা পিস টিভিতে যারা লেকচার দেন, বাংলা কিংবা ইংলিশ -- কোনোটাই শুনি না; প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া আমার ইসলামের বুঝ জাকির নায়েকসহ পিস টিভি ও তার বক্তাদেরকে ইন জেনারেল আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। Peace TV বন্ধ হওয়ায় এদেশে বিকৃত ইসলাম প্রসারের গতি কমলো -- এটাই আমার মনে হয়েছে।

একইসাথে আমি এটাও মনে করি যে, যেই অভিযোগ পিস টিভিকে ব্যান করা হয়েছে, তা নিছক অজুহাত। জাকির নায়েক কখনো জঙ্গীবাদকে উস্কে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। কিংবা পিস টিভির লেকচার শুনে শুনে ISIS জঙ্গীরা সন্ত্রাসী হয়েছে -- এটা নিতান্তই হাস্যকর কথা। ISIS এর ধর্মতাত্ত্বিক বেইজ সম্পর্কে মোটেও ধারণা নেই, এমন লোকের পক্ষেই কেবল ISIS এর জন্য জাকির নায়েককে দোষ দেয়া সম্ভব। একইসাথে আমি এ বিষয়েও সচেতন যে, পিস টিভি বন্ধ করা হয়েছে আমাদের সরকারের রেগুলার “ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ” হিসেবে, এই জন…