সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বর্তমান সময়ের ইসলাম সংক্রান্ত সমস্যার উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত -- ৮. ইসলামী দল

ইসলামের নামে দেশে-বিদেশে বহু দল আছে। তিউনিশিয়া, মিশর, তুরস্ক, বাংলাদেশ...। বিভিন্ন দলের কার্যক্রম, সাফল্য-ব্যর্থতা বিভিন্ন রকম। কোনো একটি দলের সাফল্য-ব্যর্থতা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত না যে দল পদ্ধতি ইসলামে বৈধ কিনা, বরং conceptual level এ দল পদ্ধতিকে বিচার-বিশ্লেষণ করা উচিত। উপরে conceptual level এ ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতির সমস্যা নিয়ে একটু আলোচনা করেছি। এখানে বাংলাদেশে আমাদের সুপরিচিত ও সবচেয়ে বড় ইসলামী দলটার দিকে উপরোক্ত conceptual discussion এর প্রেক্ষিতে আলোকপাত করা যেতে পারে।

মওলানা মওদূদীর (রহ.) হাত ধরে জামায়াতে ইসলামী যখন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন তিনি যে গুটিকয়েক মানুষকে সাথে নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন, তাঁদের তাক্বওয়া, জ্ঞান, নিষ্ঠা – কিছুরই কমতি ছিলো না। প্রথম যখন এই দল প্রতিষ্ঠা হলো, তখন অল্প সময়ের মাঝে ইসলামের বেশকিছু কাজ করা সম্ভব হলো। আগে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিবর্গ ইসলামের যেটুকু কাজ করতেন, এখন দলবদ্ধ হয়ে কাজ করায় কম সময়ে বেশি ফলাফল পাওয়া গেলো। একটা স্ট্রাকচার দাঁড় করানো হলো। বিভিন্ন পদ-পদবী তৈরী করা হলো। জেলা-থানা-শাখা ইত্যাদি ডিভিশান হলো। সময়ের সাথে সাথে দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকের সংখ্যা বাড়লো, কলেবর বাড়লো। দলের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড, ইসলামী বইপুস্তক বিলি করাসহ নানান ধর্মীয় কর্মকাণ্ড চোখে পড়ার মত করে সমাজে বৃদ্ধি পেলো। এগুলো সবই ভালো দিক, নিঃসন্দেহে। কিন্তু যে ব্যক্তির conceptual level এ ইসলামের কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য দল পদ্ধতির বিরোধী, এই সাময়িক বা বাহ্যিক ভালো কর্মকাণ্ড দেখলেও তিনি দল পদ্ধতির বিরোধিতাই করবেন। কারণ, তিনি জানেন যে, ইসলামের প্রচার-প্রসারে দল পদ্ধতি সর্বোত্তম পন্থা নয়। যদি এটা সর্বোত্তম পন্থাই হতো, তবে এই কনসেপ্ট আল্লাহ রাসূল (সা.) দিয়ে যেতেন। দ্বীন (ইসলাম), নবী (মুহাম্মদ), ঐশী কিতাব (কুরআন) ও স্রষ্টা (আল্লাহ) সম্পর্কে যার conceptual level এ ফিলোসফিকাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে, সে ব্যক্তি অবশ্যই এজাতীয় দল পদ্ধতির বিরোধিতা করবে, কারণ আল্লাহ তা'আলাকে পরম জ্ঞানী বলে সে জানে ও মানে, খতমে নবুওয়্যাতকে সে উপলব্ধি করেছে, এবং কনসেপ্ট হিসেবে দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণতা, অর্থাৎ স্থান-কাল-পরিবেশ-উর্ধ্ব সর্বজনীনতা সম্পর্কে তার আস্থা আছে।

এরপর একজন স্কলারের চিন্তাপ্রসূত দলটির একটি স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে গেলো। সেই স্ট্রাকচারে অসংখ্য মানুষ এসে জড়ো হতে লাগলো। কিন্তু এই দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বা সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে কোনো রিসার্চ সেন্টার ছিলো না। যদি থাকতো, তবে হয়তো কোনোদিন সেই রিসার্চ সেন্টারে এই ফিলোসফিকাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংগুলোকে রিয়ালাইজ করা হতো, এবং তখন রিসার্চ সেন্টারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দলটিকে বিলুপ্ত করা হতো। কিংবা আজও যদি দলটির সর্বোচ্চ ক্ষমতা / নেতৃত্ব একটি নিরপেক্ষ, স্বাধীন রিসার্চ সেন্টারের হাতে থাকতো, তবে সেখানে গিয়ে এই ফিলোসফিকাল আলোচনাগুলোকে পরিপূর্ণ আকারে পেশ করা যেত; এরপর আশা করতে পারতাম যে, তাদের উপলব্ধি হবে এবং দলটিকে বিলুপ্ত করে দিয়ে তাঁরা ইসলামের কাজ অব্যাহত রাখবেন, তবে নবীজির (সা.) অনুসৃত কনসেপ্টে, নিজেদের আবিষ্কৃত পন্থায় নয়।

কিন্তু তা হয়নি। যদিও দলের অধীনে কিছু "রিসার্চ সেন্টার” আছে, কিন্তু সেগুলো প্রকৃত অর্থের কোনো রিসার্চ সেন্টারই নয়। বিভিন্ন পেশাজীবি চাকুরিজীবি চিন্তাশীল মানুষেরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর যেটুকু সময় পান, এবং সেই সীমিত সময়ে ইসলাম নিয়ে যেটুকু চিন্তা-ভাবনা করেন, সেটাই ঐ রিসার্চ সেন্টারে পেশ করা হয়। Full-fledged research center নয় সেগুলো। যারা উন্নতবিশ্বের বিভিন্ন রিসার্চ সেন্টার / রিসার্চ একাডেমি সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা জানেন যে, পূর্ণাঙ্গ রিসার্চ সেন্টার কী জিনিস। সেই অর্থে জামায়াতের এই রিসার্চ সেন্টারগুলো কোনো রিসার্চ সেন্টারই নয়।

দ্বিতীয়তঃ, এই রিসার্চ সেন্টারগুলো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারনী নয়। এগুলোর কর্মকাণ্ড কেবল কিছু পাবলিকেশানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রিসার্চারগণ, আলেমগণ কিংবা জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ যদি স্বাধীন না হন, তারা যদি কারো বেঁধে দেয়া সীমারেখায় জ্ঞানচর্চা করেন, তবে তার ফলাফল কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। জামায়াত ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর কর্মীদের নির্দিষ্ট সিলেবাসের কিছু বই পড়তে হয়, কিন্তু সেখানে সাধারণত এই রিসার্চ পেপারগুলো থাকে না। এরকম কিছু রিসার্চ সেন্টার থেকে প্রকাশিত কিছু রিসার্চ পেপার পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি, সেখানে কোনো কোনো ব্যক্তি খুবই যৌক্তিক কিছু বিষয় উত্থাপন করেছেন, কিন্তু তার আট-দশ বছর পরেও সংগঠনে সেই যৌক্তিক চিন্তার প্রতিফলন নেই। এর কারন হলো, সংগঠনের উপর কোনো কর্তৃত্বই আসলে ঐ রিসার্চ একাডেমীর নেই। সংগঠন চলছে সেই একজন স্কলারের দিয়ে যাওয়া স্ট্রাকচার অনুসারে। আর রিসার্চ একাডেমীগুলো সেটার অধীন হয়ে কাজ করছে এমনভাবে যে, তারা মূল স্ট্রাকচারে হাত দিতে পারবেন না। অর্থাৎ, মওলানা মওদূদীর (রহ.) যদি কোনো ভুল হয়ে গিয়েও থাকে, তবুও বংশ পরম্পরার মত সংগঠনটি সেই ভুলকেই লালন করে আসবে। কোনো রিসার্চার যদি সেই ভুল দেখিয়েও দেন, তবুও সংগঠনে সেটার প্রতিফলন হবে না, কারণ জ্ঞানী ব্যক্তিদের (রিসার্চারদের) প্রকৃত মর্যাদা এখানে করা হচ্ছে না।

আমার যা মনে হয়েছে তা হলো, এই নামকাওয়াস্তে রিসার্চ সেন্টারগুলো সমাজের ইসলাম নিয়ে চিন্তিত ব্যক্তিদেরকে একপ্রকার বুঝ দিয়ে শান্ত করার ব্যবস্থা। কারণ তাদের চিন্তা ও রিসার্চের ফসল ঐসব প্রকাশিত বইয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ, এমনকি সেগুলো তাদের জনশক্তিকেও (অনুসারী) পড়তে দেয়া হয় না, পাছে তাতে সংগঠনের ঐতিহ্যিক কর্মকাণ্ড প্রভাবিত হয়!

এভাবে, প্রথমতঃ কোনো পূর্ণাঙ্গ রিসার্চ সেন্টার না থাকা, দ্বিতীয়তঃ সেই রিসার্চ সেন্টারকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সর্বোচ্চ ক্ষমতা না দেওয়ার ফলে সংগঠনের ভুল-ত্রুটির সংশোধন হচ্ছে না, হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই, বরং নিষ্ঠার সাথে এর অনুসারীরা দোষ-ত্রুটিগুলোকেও লালন করে যাচ্ছে। আর তার ফলাফল হলো বর্তমান জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো। মওলানা মওদূদীর (রহ.) প্রতিষ্ঠিত সেই জামায়াতে ইসলামী আর বর্তমান জামায়াতে ইসলামীর আকাশ পাতাল ফারাক। কারণ ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়। যুগের সাথে সাথে এবং সংগঠনের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে এতে বিভিন্ন স্তরে অনেক অন্যায়-অপকর্ম ও দোষ-ত্রুটির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, কিন্তু সেগুলো সংশোধন কিংবা উন্নয়নের কোনো সুযোগ সাংগঠনিক স্ট্রাকচারেই না থাকায় দিনদিন অবনতি ঘটছে। নৈতিক অবনতি, স্ট্র্যাটেজিকাল অবনতি, জ্ঞানগত অবনতি...। সংগঠনে যেকোনো সময় ডাইন্যামিকালি যেকোনো ধরণের পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকা উচিত ছিলো, এবং এই এখতিয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ রিসার্চ সেন্টারের হাতে থাকা উচিত ছিলো। সেটা না থাকায় এক প্রকার জড়তা নিয়ে সংগঠন চলছে, এবং সময়ের সাথে সাথে এতে নানান দোষ-ত্রুটির অনুপ্রবেশ ঘটছে, আর দোষ-ত্রুটির অনুপ্রবেশ যাদের হাত দিয়ে ঘটছে, তারাই সংগঠনের পিলার, কিংবা দেয়ালের ইট। তারপর সেই দোষ-ত্রুটি, জ্ঞানগত অবনতি, নৈতিক অবনতি ও স্ট্র্যাটেজিক অবনতিকে তারা বংশধারায় পাওয়া মূল্যবান সম্পদের মতই নিষ্ঠাসহকারে লালন করে যাচ্ছেন।

গোড়াতেই ইসলাম প্রচারের জন্য নবীর অনুসৃত পন্থার বাইরে নতুন পন্থা আবিষ্কার করাটা ভুল হয়েছিলো। এরপর প্রথমে দেখতে সবকিছু ভালোই লাগছিলো, কিন্তু ধীরে ধীরে দল পদ্ধতির সমস্যাগুলো প্রকাশ পেতে লাগলো। সময়ের সাথে আজকে তা সাধারণ মানুষের চোখেই প্রকাশ্য, যা একসময় শুধু জ্ঞানী ও চিন্তাবিদেরা বুঝতে পারতেন। সময়ের সাথে সাথে সাংগঠনিক জড়তা সহকারে জামায়াত-শিবির যতই অগ্রসর হবে, ততই শয়তান নিত্য-নতুন কৌশলে এর মাঝে ক্ষতিকর জিনিসের অনুপ্রবেশ ঘটাবে। কারণ এখানে একটা জিনিস আছে, তা হলো দলীয় আনুগত্য। দলের অনুসারীরা নিষ্ঠা সহকারে দলকে আঁকড়ে ধরে থাকে, দলের আনুগত্য করে। দল তো আর মানব-বিচ্ছিন্ন কোনো আর্টিফিশিয়ালি ইন্টেলিজেন্ট এজেন্ট না, বরং যখন কোনোকিছুকে "দলীয় সিদ্ধান্ত” বলে ঘোষণা করা হয়, তখন সেই সিদ্ধান্ত আসলে গুটিকয়েক মানুষের গৃহীত সিদ্ধান্ত। আর এই গুটিকয়েক নীতিনির্ধারক মানুষেরা যদি একটি ভুল সিদ্ধান্ত দেন (এবং অসংখ্য দিয়েছেনও), তখন গোটা জনশক্তি সেটাকে নিষ্ঠা সহকারে লালন করে। শয়তান ও শয়তানের এজেন্টদের লক্ষ্যই থাকে সেই নীতিনির্ধারণী পদ দখল করা, অতএব কিছু লোক খুব দ্রুত চমৎকার আনুগত্য ও আমলের নিদর্শন দেখিয়ে উপরের পদে উঠে যান।

বিভিন্ন জিনিস উপহার দেয়া, কিংবা হোটেল রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ানো, ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদেরকে সংগঠনের টাকায় ট্যুরে নিয়ে যাওয়া, দরিদ্র ছাত্রদেরকে টিউশনি যোগাড় করে দেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে দলে টানার চেষ্টা করা হয়। আরো যে কত অসংখ্য নীতি বিবর্জিত কাজ করা হয়, তা লিখতে গেলে লেখার মাঝে কলুষ প্রবেশ করবে। একজন যখন বাইরে থেকে জামায়াত-শিবিরকে দেখে, তখন বেশ ভালো লাগতে পারে। এরপর যখন সে সমর্থক থেকে শুরু করে কর্মী, সাথী, সদস্য ইত্যাদি উপরের স্তরে প্রবেশ করতে থাকে, ততই তার কাছে প্রকাশ পেতে থাকে দলের dirty secrets, darkness। কিন্তু ততদিনে সে সংগঠনের সাথে "জড়িয়ে গেছে”, তাই তার পক্ষে আর বের হয়ে আসা সম্ভব হয় না। এরপরও গুটিকয়েক সাহসী মানুষ যদিওবা বেরিয়ে আসেন, তাদেরকে সংগঠনের পক্ষ থেকে মুরতাদ আখ্যা দেওয়াসহ তার ব্যাপারে গোটা সংগঠনে অপবাদ ও নেগেটিভ কথাবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেনো তার যৌক্তিক কথায় আরো কেউ দল থেকে বেরিয়ে না যায়।

কিন্তু তারাও যদি সঠিক পন্থায় জ্ঞানচর্চা না করে, তখন দেখা যায় তাদের কারো ধ্যান-জ্ঞান হয়ে পড়ে জামায়াত-শিবিরের বিরোধিতা করা, কেউবা আবার আরেক দলের পাল্লায় পড়ে, যারা একইভাবে কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ অপব্যাখ্যা করে নিজেদেরকে জাস্টিফাই করছে। প্রত্যেকেই কুরআন ও "সহীহ হাদীস” থেকে রেফারেন্স দেয় নিজেদের পক্ষে, অথচ এটা নিজেদের মাথায়ই ক্লিক করে না যে, কিভাবে করে একই কুরআন ও একই "সহীহ” হাদীসের অনুসারীরা পরস্পবিরোধী হলো! কিন্তু তারা প্রত্যেকেই যদি কুরআন ও হাদীস থেকে সঠিক পন্থায় জ্ঞান অর্জন করতো, সঠিক পদ্ধতিতে তাৎপর্য গ্রহণ করতো, তাহলে আর এই পরস্পরবিরোধিতা থাকতো না।

এখন, “দলের স্বার্থে” এই সব কর্মকাণ্ডেরই বৈধতা দিয়ে থাকে তারা। প্রথমতঃ, ইসলামের সংকীর্ণ উপস্থাপনের মাধ্যমে, কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার (বা অপব্যাখ্যার) মাধ্যমে দলকে বৈধতা দেয়া হয়, এরপর "দলীয় স্বার্থের” নাম করে যেকোনো কাজকে বৈধতা দেয়া হয়।
দলের নাম প্রচারের জন্য ব্যানার টানিয়ে দুস্থ মানুষকে দান-সদকা করা হয়, সেইসাথে তাদের তোলা হয় ছবি! এটা যে কত বড় ইসলামবিরোধী কাজ! দুস্থ মানুষকে গোপনে দান করতে হবে, তার মান-সম্মান নষ্ট হয়, এমনভাবে দান করা যাবে না, ইত্যাদি জ্ঞান কুরআন-হাদীস থেকে তারাই পেয়ে থাকে, কিন্তু "দলীয় স্বার্থে” দলের প্রচার-প্রসারের জন্য এই কাজটি করে থাকে।

বায়তুল মাল নামে যে টাকার ফান্ড তৈরী করা হয়েছে, তা সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের "নেতৃবৃন্দ” তাদের বুঝমতন ব্যয় করে যাচ্ছে। হোক সেটা জামায়াতে কি শিবিরে। প্রথমতঃ, এখানে কোনো ইসলামী রাষ্ট্রই নেই যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কনসেপ্ট আসবে। দ্বিতীয়, এই কোষাগার থেকে কিভাবে কোথায় কী ব্যয় হবে, তা ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অনুমোদনক্রমে ও নির্ধারিত সীমায় ব্যয় হবে। অথচ নাম বায়তুল মাল দেয়া হলেও সেই টাকা দিয়ে "সাংগঠনিক ট্যুর” এর নামে দলীয় লোকজনকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ট্যুরে যাওয়া, কোনো উর্ধ্বতন দলীয় নেতা আসলে ব্যাপক খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা, নানান প্রোগ্রামে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে ফুলসহ নানান জিনিস দিয়ে সাজানো, ইত্যাদি সবই করা হচ্ছে। এ-ই কি হযরত ওমরের (রা.) বায়তুল মাল? কিংবা হযরত আলীর (রা.)? অথচ সর্বোচ্চ নৈতিকতার অনুপম নিদর্শনের এই কথাগুলো তারাই আবার সিলেবাসভুক্ত বইয়ে পড়ছে।

"বাইয়াত" এর প্রকৃত ইসলামিক কনসেপ্ট আর জামায়াত শিবিরে যে বাইয়াত চালু আছে, তা এক নয়। আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত নবীর কাছে যে আনুগত্য, সে আনুগত্য ভঙ্গ করলেই মানুষ ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়, কিন্তু জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব, যারা অধঃস্তনদের আনুগত্য কিনে থাকেন, তারা কেউ-ই আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত নন, বরং তাদের জ্ঞানগত ও আমল-আখলাকের বহু ত্রুটি সাধারণ চোখেই ধরা পড়ে। এমতাবস্থায় তাদের আনুগত্যকে রাসূলের (সা.) আনুগত্যের সাথে এক কাতারে ফেলাটা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে কুরআন-হাদীসের অপব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।

দলের "নেতাদের রক্ষা করাটা” "দলীয় স্বার্থে" প্রয়োজন, আর "আমাদের দল হলো ইসলামের স্বার্থে"। অতএব যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অংশগ্রহণ করতে হবে, যদিও তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থনা করার ব্যাপারে কুরআনে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে। তারপর যখন ইসলামের স্বার্থে দল, দলের স্বার্থে নেতা, নেতাকে রক্ষার্থে (তাগুতের) কোর্টে অংশগ্রহণ, এবং "ট্রাইব্যুনালে অংশগ্রহণের স্বার্থে” দেশ-বিদেশ অসংখ্য জায়গায় বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানকে ঘুষ দেয়া হচ্ছে, তখন সবই জায়েজ! এইভাবে করে নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো যা খুশি তারা করে যাচ্ছে, এবং সবকিছুকেই "দলীয় স্বার্থে” বলে বৈধতা দান করছে, যেহেতু শুরুতেই দলকে (ইসলামের বিকৃত ও আংশিক ব্যাখ্যা দ্বারা) বৈধতা দান করেছে।

সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার যেটা ঘটে তা হলো, বারবার দলের নাম, দলের জন্য, দলীয় স্বার্থ, দলের নেতা ইত্যাদি শুনতে শুনতে ও এগুলোর জন্য কাজ করতে করতে জনশক্তির মাঝে স্ট্যান্ডার্ড ও লক্ষ্য সেট হয়ে যায় "দল"। তা সেটা তারা মুখে স্বীকার করুক বা না-ই করুক। দলের প্রচার-প্রসার, দলের কর্মী বৃদ্ধি, ইত্যাদি ইত্যাদি...। তখন কোনো জিনিসকে যদি দেখিয়ে বলা হয় যে, তোমাদের এই কাজটি ইসলামবিরোধী, তখন সেটা মন থেকে মানতে পারে না। কারণ সেটাতো সংগঠনবিরোধী না! এটা কি করে হয় যে, যে কাজ সংগঠনের উপকারের জন্য করা হচ্ছে, তা ইসলামবিরোধী হবে? কারণ সংগঠনই তো ইসলামী সংগঠন, এটিই তো জান্নাতি সংগঠন...। ইত্যাদি অনুভুতি তখন পেয়ে বসে। দলীয় প্রেজুডিস গ্রাস করে, এবং এই জিনিসটা সবচেয়ে ক্ষতিকর।

হরতালে গাড়ি ভাঙচুর, বিভিন্ন জায়গায় আগুন দেয়া, গাছ কেটে / উপড়ে ফেলা, ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের বৈধতা কী? উত্তর হলো দলীয় স্বার্থে, আর দল ইসলামের স্বার্থে। কেউবা আবার একটু অগ্রসর হয়ে কুরআন-হাদীসের কিছু রেফারেন্স আনার চেষ্টা করেন। অথচ গাছ কাটা / উপড়ে ফেলা প্রসঙ্গে কুরআন-হাদীসে যে রেফারেন্সগুলো এসেছে, সেগুলো যুদ্ধের ময়দানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। হরতাল কি যুদ্ধ? নিরস্ত্র অবস্থায় সশস্ত্র শত্রুর মুখোমুখি হওয়াটা কি যুদ্ধ? ইসলাম কি এমন যুদ্ধ করতে বলেছে? শত্রুকে (পুলিশকে) হত্যা করবো না, কিন্তু আঘাত করবো, এই নীতি নবীজি কবে দিয়েছেন? ইসলামে যুদ্ধ হলো প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রকে হেফাজত করার জন্য, এমনকি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যও নয়। এর আগ পর্যন্ত নীরবে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যেতে হবে। হয় সশস্ত্র যুদ্ধ, নয় নীরব দাওয়াত, কিন্তু এর মাঝামাঝি কোনো আধা-যুদ্ধ বা হরতাল বলে ইসলামে কিছু নেই। অথচ (প্রথমতঃ) নবীর সুন্নাত থেকে বেরিয়ে এসে দল প্রতিষ্ঠা করে, এরপর দলের জন্য কাজ মানেই ইসলামের জন্য কাজ বলে, অতঃপর দলীয় স্বার্থে এমনকি স্পষ্ট কুরআনবিরোধী ও বিবেকবিরোধী কাজও অবলীলায় করে যাচ্ছে, কারণ সেটা করছে দলের স্বার্থে, আর দল হলো ইসলামের স্বার্থে! প্রয়োজনে নাকি হারামও হালাল হয়ে যায়।

সমস্যা হলো, জামায়াত-শিবিরের জনশক্তিকে সিলেবাসভুক্ত বই পড়তে হয়। এবং শুরুতেই তাদেরকে নিজেদের দলকে ও দলীয় কর্মকাণ্ডকে ডিফেন্ড করার জন্য কুরআন থেকে কিছু আয়াত, কিছু পছন্দমতো হাদীস ইত্যাদি মুখস্ত করানো হয়, যেনো তা দ্বারা মানুষকে দলে টানতে পারে, এবং প্রশ্নের সম্মুখীন হলে ঐসব রেফারেন্স দিয়ে নিজেদেরকে ডিফেন্ড করতে পারে। অথচ এগুলো সবই ইসলামের আংশিক উপস্থাপন, কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা। স্বাভাবিকভাবেই তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে জাস্টিফাই করার জন্য মানুষকে রেফারেন্সের ময়দানে নিয়ে যাবে, এবং সেখানে তার অস্ত্র তো প্রস্তুত আছেই : কুরআন থেকে quote mining করে বের করা কিছু আয়াত ও কিছু পছন্দমতো হাদীস। অথচ এই একই রেফারেন্সের ময়দানে যে তাদের বিরোধিতা করার মত অসংখ্য রেফারেন্স আছে, তা তারা নিজেরাও হয়তো জানে না। আর যেসব সাধারণ মানুষকে ঐসব কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে ডাকা হয়, তারাতো ধর্মীয় রেফারেন্সের ব্যাপারে আরো অজ্ঞ।

এইভাবে করে কুরআন হাদীস থেকে পছন্দমতো অংশ তুলে নিয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে জাস্টিফাই যে শুধু জামায়াত-শিবির করছে তা না, প্রতিটি দল/মতই করছে। এবং বেশিরভাগই সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে এই কাজগুলো করছে। অথচ এটা যে কত বড় ভয়ানক কাজ, কিতাবুল্লাহ (কুরআন) যে ছেলেখেলার বস্তু নয়, মুহাম্মদের (সা.) অনুসারী বলে নিজেকে দাবী করে তাঁরই পন্থা ও শিক্ষার বিপরীত কাজ করার ভয়াবহতা যে কতখানি – সে সম্পর্কে এই রেফারেন্স যোদ্ধারা বেখবর। ঐশী কিতাবের মর্যাদা না জেনেই কুরআনকে নিয়ে যা-খুশি-তাই করছে। খোদায়ী কিতাবের মর্যাদা বুঝতে হলে প্রথমে খোদাকে চিনতে হবে, তাঁর মর্যাদা মাহাত্ম্যকে পূর্ণশক্তিতে অনুধাবন করতে হবে। নবীর মর্যাদা অনুধাবন করতে হবে, নবীকে বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে চিনতে হবে। কিন্তু এই মৌলিক বিষয়ের কমপ্লিট জ্ঞানগত ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি না থাকার ফলে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপ কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলকে (সা.) ছেলেখেলার বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলেছে, এবং এক আল্লাহ ও এক নবীর নাম করে পরস্পরকে কাফির-মুরতাদ ফতোয়া দেয়া, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করছে। ISIS, আল কায়েদাসহ চরমপন্থী যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপ আরব দেশে ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে, সেসব গ্রুপকেও একইভাবে হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে কুরআন-হাদীসের বিকৃত ব্যাখ্যা, ইসলামের partial representation

ইন্টারনেটের কল্যাণে শিবিরের সকল পর্যায়ের সিলেবাসের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। শত শত বই! শত শত বই কেনো, আট-দশটা মৌলিক গ্রন্থ ভালোভাবে অধ্যয়ন করলেই এক একজনের ইসলামী স্কলার হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ তাদের মাঝে সেরকম কেউ-ই নেই! আসলে এজাতীয় সিলেবাসের ফলে নিজেদেরকে জ্ঞানী ভাবার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। অথচ ঐযে, শুরুতে যে আলোচনা করেছিলাম, জ্ঞান অর্জনের সঠিক পদ্ধতি না জানার ফলে এত পরিশ্রম, এত বই পড়া কোনোই কাজে আসে না। যদি সত্যিই কাজে আসতো, তাহলে সারা দেশে লক্ষ লক্ষ কর্মী-সাথী-সদস্যের জ্ঞান গবেষণার ফলাফল হিসেবে আমরা বিস্ময়কর কিছু লক্ষ্য করতাম। এই শতাধিক বই পড়া এই লক্ষ লক্ষ ছেলেদের একজনও আসলে রিসার্চার নয়। নয়তো লক্ষাধিক রিসার্চারের এক মহাবিপ্লব দুনিয়ার ইতিহাসে লিখিত হতো।

জ্ঞানচর্চার সঠিক পদ্ধতি জানা নেই বলেই এভাবে করে সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছে। যারা শিবির করেছেন কিংবা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন যে, রিপোর্ট বইয়ে নিজের ফলাফল ভালো হিসেবে উপস্থাপনের জন্য কী করা হয়। সিলেবাসভুক্ত বই থেকে দায়িত্বশীল ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে পাশ / ফেল নির্ধারণ করেন, যার ভিত্তিতে তাকে উপরের পদে উঠতে দেয়া হয়। প্রথমতঃ, যে দায়িত্বশীল বিভিন্ন বইয়ের উপর অধঃস্তনের জ্ঞান যাচাই করেন, তিনি নিজেই ঐ বইগুলোর উপর পণ্ডিত নন, এবং তিনি কোনো রিসার্চারও নন, বরং বাস্তবতা এই যে, ঐ বইগুলো ব্যবহার করে মৌলিক ফিলোসফিকাল প্রশ্ন করা হলেই সেই দায়িত্বশীল নিজেই জবাব দিতে পারবেন না। দ্বিতীয়তঃ, দায়িত্বশীল কী কী প্রশ্ন করতে পারেন, তা-ও সাজেশান আকারে পাওয়া যায়। এভাবে করে দায়সারা বই পড়া ও দায়সারা পরীক্ষা দেয়া হয়। এগুলো মোটেই জ্ঞানচর্চা নয়, কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এখানে true sense এর কোনো রিসার্চ হয় না। বরং ছেলেদের হাতে এভাবে ভুল পন্থায় কিছু রেফারেন্স তুল দিয়ে তাদেরকে জ্ঞানী ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া হয়। এতে প্রেজুডিস তৈরী হয়, এবং নিরপেক্ষ উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

আবার, ইসলামী কর্মকাণ্ড করার জন্য দল পদ্ধতি আবিষ্কার করা, তারপর নিজেরাই সেই দলের বিভিন্ন নিয়ম-নীতি তৈরী করা (শিবিরের অন্তর্ভুক্ত থাকতে হলে ছাত্র হতে হবে), এবং নিজেরাই সেগুলোকে বাইপাস করার জন্য পদ্ধতি বের করা (সবসময় কোনো না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নামকাওয়াস্তে ছাত্র হয়ে থাকা) – এগুলো ঘটছে। এটা ঘটবেই, কারণ এত সব সমস্যার গোড়া এক জায়গায় – আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) জ্ঞানের উপর আস্থা না থাকা, ইসলামের পরিপূর্ণতার অর্থ না বোঝা, নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করে দল পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। যেগুলো আমি উল্লেখ করলাম, এসব সমস্যা হলো সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের অল্প কিছু সমস্যা। সকল সমস্যার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। কেউ যদি সমস্যার গোড়ায় দৃষ্টিপাত করে, তখন সে আর সবকিছু এমনিই বুঝতে পারবে।

জামায়াতের নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে দেবতুল্য ভক্তি ও আনুগত্যের আবহাওয়া সৃষ্টি করা হয়েছে গোটা সংগঠনে। অথচ জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ইন্টারনাল পলিটিক্সের ইতিহাস যারা জানেন, সেই "our little dirty secrets” যারা জানেন, তারা স্পষ্ট বুঝতে পারেন যে, আসলেই দ্বীনি নেতৃত্বের যোগ্যতা তাদের আছে কিনা।

বিভিন্ন স্তরের ধর্মীয় মান তথা কর্মী, সাথী, সদস্য – ইত্যাদির কোনো কনসেপ্ট আল্লাহর রাসূল (সা.) দিয়ে যাননি। জামায়াত-শিবিরের প্রতিষ্ঠার পর প্রাথমিক অবস্থায় আপাতঃ দৃষ্টিতে এগুলোর কিছু ভালো ফলাফল দেখা গেলেও পরম জ্ঞানী আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর নবী মহামানব মুহাম্মদ (সা.) এর চেয়ে আগ বাড়িয়ে করা এই কাজের নোংরা ও ক্ষতিকর দিকটি পরবর্তীতে প্রকাশিত হলো। বিভিন্ন ধর্মীয় মান, সাথী, সদস্য ইত্যাদি পদবী দেয়ার মাধ্যমে একজন মানুষকের নিজের তাকওয়া সম্পর্কে উচ্চ ধারণা লাভ করার সুযোগ হয়, যা সুস্পষ্ট রিয়া। প্রথম স্তর কর্মী, দ্বিতীয় স্তর সাথী এবং তৃতীয় ও সর্বোচ্চ স্তর (মান) হলো সদস্য। প্রতিটা নিচের স্তরের কাছেই উপরের স্তর সম্পর্কে উচ্চ ধারণা দেয়া হয়, উপরের স্তরের ব্যক্তি হিসেবে তাদের তাকওয়া, আমল-আখলাক ইত্যাদির প্রশংসা করা হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই একজন "সাথী” মনে করে যে, “সদস্য” হওয়া মানেই ঐ লেভেলের তাক্বওয়া অর্জন করা, ঐরকম উন্নত আমল-আখলাকের অধিকারী হওয়া। এরপর সে নিজে যখন সদস্য হয়, তখন তার মধ্যে ঐ অনুভূতি কাজ করে, তৃপ্তি বোধ হয়। আর নিজের আমল-আখলাকের ব্যাপারে তৃপ্তি হলো বড় ধরণের রিয়া, আল্লাহর বিরুদ্ধে একপ্রকার বিদ্রোহ। যাহোক, সেটা তাযকিয়ায়ে নফস (আত্মশুদ্ধি) টপিকের আলোচ্য বিষয়।

সেক্যুলার সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়ে একজন দ্বীনি ব্যক্তিত্ব কিভাবে সেক্যুলার সংবিধান রক্ষার শপথ করতে পারেন? কুরআনের সংগ্রামই হলো সেক্যূলার যত (সং)বিধানের বিরুদ্ধে, আর সেই কুরআনের দায়ী, কুরআনের অনুসারী হয়ে কিভাবে কুরআন-বিরোধী সংবিধান রক্ষার শপথ করতে পারেন একজন আলেম? আবারও সেই একই দলীয় স্বার্থে, আর দল ইসলামের স্বার্থে, ইত্যাদি অপযুক্তির (Fallacy) আশ্রয় নিয়ে এসব কর্মকাণ্ডকে জাস্টিফাই করা হয়। আল্লাহর রাসূলের (সা.) ক্ষেত্রে কি আমরা অনুরূপ কাজ কল্পনা করতে পারি?

এখন, এইরকম একটি দল যখন ইসলামের partial representation দ্বারা, কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ ও বিকৃত ব্যাখ্যা দ্বারা অনুপ্রাণিত করে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তখন সেই মৃত্যু শহীদি মৃত্যু কিনা, সে সিদ্ধান্তের ভার আল্লাহর উপরই ছেড়ে দেয়া ভালো। কারণ জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন করতে গিয়ে যারা মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন, তাঁদের নিয়ত, তাঁদের কর্মসহ আল্লাহ তা'আলা যত factor বিবেচনা করে বিচার করবেন, তার সকল ফ্যাক্টর আমাদের জ্ঞানে নেই। আর এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণও নয় যে, তাঁরা শহীদের মর্যাদা পেলেন, নাকি অন্যায়কারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হলেন। আমরা তাঁদের নিষ্ঠাকে সম্মান করতে পারি, কিন্তু ভুল কর্ম বা পন্থাকে সমর্থন করতে পারি না। আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, এই দলীয় পদ্ধতিটি বৈধ কিনা, উপযুক্ত কিনা, এবং এদের কর্মকাণ্ড সঠিক কিনা, সঠিক হলে কতটুকু সঠিক, ভুল হলে কতটুকু ভুল। এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক পন্থায় ইসলামী জ্ঞান অর্জন করা।

কারণ, ধরে ধরে অন্ধকার দূর করার পদ্ধতি ইসলামের নয়। আলো আসলে অন্ধকার দূরীভূত হয়, এটাই ইসলামের পন্থা। হ্যাঁ, কেউ যদি প্রকৃত ইসলামের প্রচার-প্রসার করতে যায়, তখন ময়দান বিশ্লেষণের নিমিত্তেই এসব তার জানা প্রয়োজন। সেটা শুধু জামায়াত-শিবির নয়, দেশের ইসলাম নিয়ে কাজ করা ভালো-মন্দ-ভণ্ড সব গ্রুপের সম্পর্কেই ধারণা নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু জামায়াত-শিবির কিংবা অন্য কোনো দল / মতের বিশাল কর্মযজ্ঞ ও ইসলাম থেকে বিচ্যুত নীতি ইত্যাদি দেখে যদি কেউ মনে করেন যে এগুলো জনসমক্ষে উন্মোচন করে জনগণকে সচেতন করাটাই সমাধান, তবে তা সঠিক নয়। কারণ তখন হয়তো কেউ কেউ জামায়াত-শিবির থেকে বের হয়ে আসবে, কিন্তু তারপর তারা অনুরূপ কিংবা আরো বেশি ভুল-ভ্রান্তি মিশ্রিত কোনো গ্রুপের পাল্লায় পড়বে। এছাড়াও যেহেতু এই সংগঠন ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের ব্যাপারে তাদের মাঝে তীব্র ধর্মীয় আবেগ কাজ করে, সেহেতু যৌক্তিকভাবে তাদের অসঙ্গতি ও ইসলামবিরোধী পদ্ধতি / কর্ম ইত্যাদি তুলে ধরলেও সেটা তারা মেনে নিতে পারবেন না, বরং দলকে আরো বেশি আঁকড়ে ধরবেন, আর যৌক্তিকভাবে দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা ব্যক্তিটির প্রতি বিরূপ হয়ে যাবেন। এটা শুধু জামায়াত-শিবিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না, বরং এটা একটা সাধারণ নীতি, যা সকল মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদিও ভ্রান্ত নীতির উপর ভিত্তি করে ইসলামী দল প্রতিষ্ঠা করে নানান ইসলামী নীতি-বিচ্যুত ও ইসলামবিরোধী কাজ জামায়াত-শিবিরের হাত ধরে ঘটছে, এবং যদিও এইসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশে প্রকৃত ইসলামের প্রচার-প্রসারের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছেন, তবুও জনসমক্ষে তাদের একেবারে ভিতরের dirty secrets তুলে ধরাটা সঠিক পন্থা নয়।

বরং সঠিক পন্থা হলো জ্ঞান-গবেষণার মাধ্যমে অতি সতর্কতার সাথে ইসলামের সঠিক পন্থাটি জেনে নেয়া। নয়তো আরো কারো হাত ধরে নিষ্ঠার সাথে দল পদ্ধতির মতো আরো কোনো ক্ষতিকর পদ্ধতি বের হয়ে আসবে, যেই বিষবৃক্ষের ফল আরো পরে সমাজে প্রকাশিত হবে। তাই আমি মনে করি, ইসলামের পবিত্র পতাকা স্পর্শ করার আগে, ইসলামের torch bearer হওয়ার আগে আত্মশুদ্ধি করা প্রয়োজন, এবং জ্ঞান অর্জনের সঠিক পদ্ধতিতে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে প্রতিটা স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিংসহ দ্বীনি নেতৃত্বের ন্যুনতম যোগ্যতার জ্ঞানগত স্তরে পৌঁছানো প্রয়োজন। অতঃপর কেউ যদি নিজের অন্তরে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুভব করে যে, এটা আল্লাহরই ইচ্ছা তিনি ইসলামের পতাকাবাহী হবেন, তখন জনগণের মাঝে বেরিয়ে পড়া উচিত এবং দ্বীনের কাজ করা উচিত। লক্ষ্য রাখা উচিত, মানবজাতির ইতিহাসে আল্লাহ তায়ালা ইসলামের পবিত্র পতাকা বহনের জন্য নিষ্পাপ ও নির্ভুল মানুষদেরকেই (নবী-রাসূলগণ (.)) নির্বাচন করেছেন। বরং নিষ্পাপত্ব হলো নবুওয়্যাতের একটি অপরিহার্য গুণ। নিষ্পাপ নবী-রাসূলগণের হাতে ইসলামের পতাকা নিরাপদ ছিলো। তাঁদের জ্ঞানগত কিংবা আচরণগত দোষত্রুটির কারণে ইসলামের কোনো ক্ষতি হতো না, ক্ষতি হয়নি। লক্ষ্যনীয় যে, যদিও নবী-রাসূলগণের (.) বেশিরভাগই জীবনের একটা নির্দিষ্ট বয়সে আল্লাহর সুস্পষ্ট আদেশ পাওয়ার পরেই ইসলামের পতাকা হাতে বেরিয়ে পড়েছেন। অথচ তাঁরা জন্মের পর থেকেই নিষ্পাপ জীবন যাপন করেছেন, এবং আচরণগত ত্রুটির আশঙ্কা তাঁদের ছিলো না। তবুও তখনই কেবল ইসলামের পতাকা হাতে বেরিয়ে পড়েছেন, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট আদেশ পেয়েছেন। মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁদের হাতেই ইসলামের পবিত্র পতাকাকে ন্যস্ত করেছেন, entrust করেছেন, যাঁদের হাতে ইসলামের ক্ষতি হবার কোনোই আশঙ্কা ছিলো না। অনুরূপভাবে নবীর অবর্তমানে তাঁরাই ইসলামের পতাকা বহন করার যোগ্য ব্যক্তি, যাঁরা নিজেদের জ্ঞানগত যোগ্যতার ব্যাপারে দৃঢ় নিশ্চয়তা লাভ করেছেন, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নিজের অন্তরে ইসলাম প্রচারের আধ্যাত্মিক আদেশ অনুভব করেছেন। আর নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ তা'আলা এমন কোনো ব্যক্তির অন্তরে ইসলাম প্রচারের জন্য আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা দান করবেন না, যে ব্যক্তির হাতে ইসলামের পতাকা অনিরাপদ। আর আল্লাহ তা'আলা যদি কারো অন্তরে সেই আদেশ দান করেন, সেই ব্যক্তি ইসলামের পতাকা বহনের দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতিও জানাবে না, বরং নবীর মত করেই জনগণের মাঝে সর্বোত্তম আখলাক, জ্ঞান, যোগ্যতা ও কর্মপন্থাসহকারে ইসলাম প্রচার করে যাবেন।
তবে ইসলামের দায়ী (দাওয়াত দানকারী) হবার পূর্বশর্ত হিসেবে আমি যে পূর্ণ জ্ঞানগত যোগ্যতা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে আধ্যাত্মিক আদেশের কথা বললাম, সে বিষয়ে অনেকেই দ্বিমত করবেন। এটি আলাদা আলোচনার বিষয়।

অথচ এখন চারিদিকে তাকিয়ে দেখলে আশঙ্কার সাথে লক্ষ্য করতে হয়, ইসলামের পতাকা যারা হাতে তুলে নিয়েছেন, তাদের প্রায় কারো হাতেই ইসলাম নিরাপদ নয়। কি সেটা জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, কি সেটা দেশের বিভিন্ন পীরপন্থী গ্রুপ, কি আল-কায়েদা-হিজবুত তাহরির-ISIS, কিংবা কোনো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় লেকচারার। এই মানুষেরা কেউ কেউ জেনেশুনে ইসলামের ক্ষতি করছেন, আর কেউবা না জেনেই নিষ্ঠা সহকারে ইসলামের ক্ষতি করে যাচ্ছেন। কারো হয়তো আমল-আখলাকের কোনো সমস্যা ছিলো না, এবং নিষ্ঠা ছিলো পরিপূর্ণ, কিন্তু পূর্ণ জ্ঞানগত যোগ্যতা না থাকার ফলে সেই পূর্ণ নিষ্ঠা সহকারেই ইসলামী দল প্রতিষ্ঠা করেছেন, অথচ যা আসলে ইসলামের জন্য ক্ষতিকর। আর সেইসব ইসলাম-প্রচারকের কথা তো বাদই দিলাম, যাদের দোষত্রুটি সাধারণ মানুষের চোখেই ধরা পড়ে, হোক সেটা আখলাকের ত্রুটি, কিংবা জ্ঞানগত ত্রুটি। চার বছর যারা ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রিতে পড়ে অনার্স পাশ করেন, তাদেরকে যদি বলা হয় ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রির উপর ক্লাস নিতে, তখন অধিকাংশ ছাত্রই না করবে, কারণ তারা শিক্ষকতার জন্য নিজেদের জ্ঞানগত যোগ্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত নয়; অথচ ইসলামের ব্যাপারে কত সহজেই না চারিদিকে যেকোনো মানুষ মন্তব্য করে যাচ্ছে, এমনি ইসলাম-প্রচারকও হয়ে বসছে!

জামায়াত শিবিরকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, তাই তাদের সমস্যাগুলো ভালোভাবে জানি। তবে সবসময় এটা লক্ষ্য রাখা উচিত যে, একটি দলের দোষত্রুটির দিকে মনোযোগ এত বেশি যেনো হয়ে না যায়, যেটা আমাদেরকে ইসলামের সার্বিক চিত্র, bigger picture থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে। জামায়াত শিবির ইসলামের নামে একটি ছোট দল মাত্র। ইসলামের নামে দুনিয়াব্যাপী নামে বেনামে অসংখ্য দল ও মতাদর্শ আছে। ভালো-মন্দের মিশেল এই সকল দল / মতাদর্শ থেকে আমরা তখনই প্রকৃত ইসলামকে আলাদা করতে পারবো, যখন নিরপেক্ষভাবে সঠিক পদ্ধতিতে ইসলামকে জানবো এবং জ্ঞান অর্জন করবো। এবং সে ধরণের একটি নিরপেক্ষ মন নিয়ে জ্ঞানার্জনে অগ্রসর হতে হলে নিজেকে সবধরণের চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে দূরে সরিয়ে আপন মনে চিন্তা করতে হবে। নয়তো দেখা যাবে যে, শুরুতেই আমার চিন্তাধারা কোনো একটি বিশেষ মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যাত্রা শুরু করবে। অতঃপর গোড়াতে এক ডিগ্রি বাঁকা একটি লাইন দীর্ঘ পথ চলার পর চোখে পড়বে যে, তা সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে কত দূরে‍!


ইমাম হাসানুল বান্না, সাইয়্যেদ কুতুব শহীদসহ সমসাময়িক বিভিন্ন স্কলারের লেখা, জীবনেতিহাস ইত্যাদি জামায়াত-শিবিরের জনশক্তিকে পড়ানো হয়, অথচ এমনকি একটি সফল ইসলামী বিপ্লবের নেতা হিসেবে তাঁদেরই সমসাময়িক ইমাম খোমেনীর (রহ.) নামও উচ্চারিত হয় না কোথাও। পরবর্তীতে আমি বুঝতে পারলাম যে, ইমাম খোমেনী (রহ.) যেহেতু দলীয় পদ্ধতিতে কাজ করেননি, (বরং তিনি আল্লাহ রাসূলের অনুসৃত পন্থায় দ্বীনের কাজ করে গিয়েছেন, এবং সফলও হয়েছেন) সেহেতু তাঁর জীবনেতিহাস নিজেদের জনশক্তিকে পড়তে দিলে এতে দল পদ্ধতির অসারতা সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে, যা স্বয়ং দলীয় অস্তিত্বের প্রতি হুমকি। একারণেই না সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের সমসাময়িক স্কলার হিসেবে ইমাম খোমেনীকে তারা চেনে, আর না ইরানের বিপ্লবের ইতিহাস তাদেরকে জানতে দেয়া হয়। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মিশর, তিউনিশিয়া, তুরস্ক ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস তাদেরকে পড়ানো হয়। কিন্তু একটি সফল ইসলামী বিপ্লব, সেই বিপ্লবের আধ্যাত্মিক নেতা ও একটি সফল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে simply এড়িয়ে যাওয়া হয় এমনভাবে যে, as if they don't exist ! আমি বুঝতে পেরেছি যে, এটা কেবলমাত্র একারণেই করা হয় যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে গভীরভাবে স্টাডি করলে সেটা যে দলীয় পদ্ধতির চেয়ে উন্নত পদ্ধতি (এবং আল্লাহ রাসূলের (সা.) অনুসৃত পদ্ধতি), তা জনশক্তির কাছে প্রকাশ হয়ে পড়লে দলের মাঝে সংস্কার আনতেই হবে, নয়তো নেতৃত্বে টিকে থাকাই মুশকিল হবে। একটি সত্যিকারের রিসার্চ সেন্টার (এবং যারা সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী নেতৃত্বও বটে) থাকলে সেখানে পেশ করা যেতো, কিন্তু তা-ও এখানে নেই।




এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

টাকার ইতিহাস, মানি মেকানিজম ও ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের মহা জুলুম

(লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।) **জালিমের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম**

জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাস হলো মহররম মাস।
জালিমের মুখোশ উন্মোচনের মাস মহররম।
জুলুমের কূটকৌশল উন্মোচনের মাস মহররম।
আধুনিক সেকুলার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় লেজিসলেশান (সংসদ), আর্মড ফোর্সেস (আর্মি) ও জুডিশিয়ারি (আদালত) হলো এক মহা জুলুমের ছদ্মবেশী তিন যন্ত্র, যারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে জুলুম টিকিয়ে রাখার জন্য।
তারচেয়েও বড় জালিম হলো big corporations: বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, যারা তাবৎ দুনিয়াকে দাস বানিয়ে রেখেছে।
আর এই দাসত্বের শৃঙ্খলে তারা আমাদেরকে আবদ্ধ করেছে ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের মাধ্যমে:
টাকা আমাদের শ্রমকে ধারণ করে, অথচ সেই টাকার মূল্য আপ-ডাউন করায় অন্যরা -- ব্যাংক ব্যবসায়ীরা!
টাকা আমাদের শ্রমকে সঞ্চয় করার মাধ্যম,
অথচ সেই টাকা আমরা প্রিন্ট করি না, প্রিন্ট করে (ব্যাংকের আড়ালে) কিছু ব্যবসায়ী! সেই টাকার মান কমে যাওয়া (বা বেড়ে যাওয়া) আমরা নির্ধারণ করি না -- নির্ধারণ করে ব্যাঙ্ক (ব্যবসায়ীরা)!
ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রতিবাদী চেতনাকে ধারণ করব, শোকাহত হব কারবালার স্মরণে, অভিশাপ দেব জালি…

ধর্মব্যবসা: মুসলমানদের হাতে ইসলাম ধ্বংসের অতীত-বর্তমান (১)

ভূমিকা যদিও পলিটিকাল-রিলিজিয়াস ইস্যুতে নিশ্ছিদ্র আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করে আলোচনা করার অভ্যাস আমার, কিন্তু এখানে বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরে আর্গুমেন্ট করার প্রথমতঃ ইচ্ছা নেই, দ্বিতীয়তঃ সময় ও সুযোগ নেই। আমি যা সত্য বলে জানি, তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। যারা আমার উপর আস্থা রাখেন তাদের জন্য এই লেখাটি সোর্স অব ইনফরমেশান, উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষদের জন্য সত্য অনুসন্ধানের নতুন কিছু টপিক, আর প্রেজুডিসড ধর্মান্ধ রোগগ্রস্ত অন্তরের জন্য রোগ বৃদ্ধির উছিলা। শেষ পর্যন্ত আর্গুমেন্ট ও ডায়লগের দুয়ার উন্মুক্ত রাখার পক্ষপাতী আমি, কিন্তু সেই আর্গুমেন্ট অবশ্যই সত্য উন্মোচনের নিয়তে হওয়া উচিত, নিজের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস ও ধ্যান ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করবার উদ্দেশ্যে নয়। মক্কা-মদীনা: মুহাম্মদ (সা.) থেকে আলে-সৌদ (৬২৯-১৯২৪) এদেশের অধিকাংশ মানুষ মক্কা-মদীনার ইতিহাস কেবল এতটুকু জানেন যে, মুহাম্মদ (সা.) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন। কিন্তু প্রায় চৌদ্দশ’ বছর আগে মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র থেকে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরবের ইতিহাস কম মানুষই জানেন। পবিত্র ম…

পিস টিভি, জাকির নায়েক ও এজিদ প্রসঙ্গ

সম্প্রতি গুলশান হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। আমি তখন দিল্লীতে ছিলাম। দেশে ফিরে শুনি পিস টিভি ব্যান করা হয়েছে বাংলাদেশে, এবং তার আগে ইন্ডিয়াতে।

আমার বাসায় টিভি নেই, এবং আমি জাকির নায়েকের লেকচার শুনিও না। কিংবা পিস টিভিতে যারা লেকচার দেন, বাংলা কিংবা ইংলিশ -- কোনোটাই শুনি না; প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া আমার ইসলামের বুঝ জাকির নায়েকসহ পিস টিভি ও তার বক্তাদেরকে ইন জেনারেল আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। Peace TV বন্ধ হওয়ায় এদেশে বিকৃত ইসলাম প্রসারের গতি কমলো -- এটাই আমার মনে হয়েছে।

একইসাথে আমি এটাও মনে করি যে, যেই অভিযোগ পিস টিভিকে ব্যান করা হয়েছে, তা নিছক অজুহাত। জাকির নায়েক কখনো জঙ্গীবাদকে উস্কে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। কিংবা পিস টিভির লেকচার শুনে শুনে ISIS জঙ্গীরা সন্ত্রাসী হয়েছে -- এটা নিতান্তই হাস্যকর কথা। ISIS এর ধর্মতাত্ত্বিক বেইজ সম্পর্কে মোটেও ধারণা নেই, এমন লোকের পক্ষেই কেবল ISIS এর জন্য জাকির নায়েককে দোষ দেয়া সম্ভব। একইসাথে আমি এ বিষয়েও সচেতন যে, পিস টিভি বন্ধ করা হয়েছে আমাদের সরকারের রেগুলার “ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ” হিসেবে, এই জন…