সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইসলাম - সাহাবীগণের অন্ধ অনুসরণ কাম্য নয়

সাম্প্রতিক সময়ে শিয়া-সুন্নি ইস্যুতে ফেইসবুকে ও অফলাইনে বেশ কয়েকটি বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছি। না, ভাববেন না যে আমি এখানে শিয়া-সুন্নি বিরোধের কোন বিষয়ের সমাধান দিতে এসেছি। প্রচলিত শিয়া-সুন্নি বিরোধের কিছু বিষয় থেকে শুরু করে কিছু তাত্ত্বিক কথা বলবো বড়জোর। যাহোক, বিষয়টা হলো :
নোমান আলী খান মুয়াবিয়া নামটির সাথে "রাদিয়াল্লাহু আনহু" বলেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ যার উপর রাজি। যেটাকে আমরা সংক্ষেপে লিখি : রাঃ।
ডা. জাকির নায়েক আবার এককাঠি বেড়ে মুয়াবিয়া পুত্র ইয়াজিদের নামের সাথে peace be upon him ("আলাইহিসসালাম" -- তাঁর উপরে সালাম, সংক্ষেপে আঃ) বলেছেন।
বিপরীতে, শিয়ারা উভয়কেই অপছন্দ করে থাকে, ইয়াজিদের নাম উচ্চারণের সাথে সাথে তার উপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করে, মুয়াবিয়ার ব্যাপারেও কমবেশি অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করে।

মুয়াবিয়া নবীজি (সা.) সাহাবী ছিলেন। সাধারণভাবে সুন্নিদের বক্তব্য হলো, সাহাবীগণের নামের সাথে রাদিয়াল্লাহু আনহু বা এজাতীয় কথা বলা বাধ্যতামূলক। ওদিকে শিয়ারা আবার দিচ্ছে লানত। এই নিয়ে কথা।

আমি এই পোস্ট লিখতাম না, কিন্তু আজ সকালে ইনবক্সে একটি মেসেজ পেলাম, এবং পরবর্তীতে একটি অনুরোধের ভিত্তিতে লিখছি। মেসেজটির বক্তব্য ছিলো এমন :
"মুয়াবিয়া (রা) এর পরে রাদিয়াল্লাহুআনহু এমনিতে না বললে সমস্যা হবে কিনা জানি না, তবে ঘৃণা বশত না বললে সমস্যা হবে মনে হয়, কি বলেন?"
অর্থাৎ :
১. মুয়াবিয়া এর পরে রাদিয়াল্লাহ আনহু বলা বাধ্যতামূলক কিনা, কিংবা না বললে গুনাহ হবে কিনা তা উনি নিশ্চিত নন।
২. তবে কেউ যদি মুয়াবিয়াকে ঘৃণা করে, এবং সেই ঘৃণার কারণে রাদিয়াল্লাহু আনহু না বলে, তাহলে সমস্যা হবে (গুনাহ হবে)। অর্থাৎ, মূল কথা হলো, তাঁর মতে মুয়াবিয়াকে ঘৃণা করলে গুনাহ হবে।
বক্তব্যের সপক্ষে তিনি কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। যেমন, তিনি লিখেছেন :
"রাসূল (সা.) তার সাহাবীদের গালি দেওয়া বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে সমালোচনা করতে নিষেধ করেছেন । তিনি বলেছেন : "আল্লাহ , আল্লাহ ! সাবধান ! আমার পরে তোমরা তাদেরকে সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত করো না । তাদের কে যারা ভালোবাসে , আমার মুহাব্বতের খাতিরেই তারা ভালোবাসে , আর যারা তাদেরকে হিংসা করে , আমার প্রতি হিংসার কারণেই তারা তা করে । তাদেরকে যে কষ্ট দিল সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল। আর আমাকে যে কষ্ট দিল সে যেন আল্লাহ তা'আলাকেই কষ্ট দিল। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দিল শীঘ্রই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।" (তিরমিজি, আহমাদ)" এবং --
"যারা আমার সাহাবীদেরকে গালী দেয়, তাদের প্রতি আল্লাহর,ফেরেস্তাদের,এবং জগতবাসীর অভিশাপ বর্ষিত হোক।(তাবরানী)"

কিছুদিন আগে আমি একটি ব্লগ লিখেছিলাম, যেখানে শিয়া সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব সংগ্রহ করে পোস্ট করেছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে সেটা দেখতে পারেন। (দেখুন এখানে : http://goo.gl/F1Hg6p)

যাহোক, মূল প্রশ্ন হলো : মুয়াবিয়ার (এবং এমনকি ইয়াজিদেরও) নাম উচ্চারণের সময় peace be upon him বলা যাবে কিনা, অর্থাৎ সালাম পাঠানো যাবে কিনা ? ঘৃণা করা যাবে কিনা ? গালি দেয়া যাবে কিনা ? হেয় প্রতিপন্ন করা যাবে কিনা ? ইত্যাদি।
আমি তাঁর মেসেজের জবাবে যা বলেছিলাম, সেটাকেই কিছুটা পরিবর্তন করে আবারও বলছি।

প্রথমত, গালি দেওয়া কাজটিই একটি অনুচিত কাজ। মুসলমানদের জন্য কাউকেই গালি দেওয়া সঙ্গত নয়। তবে খারাপ মানুষের উপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করা বৈধ, কিংবা আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, হেয় প্রতিপন্ন করা কাজটিও একটি অনুচিত কাজ। কোনো ব্যক্তি, তা সে যত খারাপই হোক না কেনো, এটা সঙ্গত নয় যে মুসলমানেরা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করবে। কারণ মুসলমানেরা সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী। আমাদের নবীজির ব্যবহার থেকে শিক্ষাগ্রহণ করলে দেখা যায়, তিনি কাউকেই গালি দেননি কিংবা হেয় প্রতিপন্ন করেননি। তবে, কোন ব্যক্তি থেকে মুসলমানদেরকে সতর্ক করার জন্য যদি তার স্বরূপ উন্মোচন করতে হয়, তবে সেক্ষেত্রে যথাযথভাবেই তার অপকর্ম উন্মোচন করে মানুষকে সতর্ক করা কর্তব্য। তাতে যদি সেই ব্যক্তির সামাজিক মান মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, তবুও সেটা কর্তব্য।
তৃতীয়ত, হিংসা করা কাজটিই একটি অনুচিত কাজ। কোন মুসলমান কাউকে হিংসা করতে পারে না, করা উচিত নয়। তবে কেউ অন্যায়ের শিকার হলে হলে মজলুম হিসেবে জালিমের ধ্বংস কামনা করা যেতে পারে, তার উপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করা যেতে পারে।
মোটকথা, গালি দেওয়া, হেয় প্রতিপন্ন করা, হিংসা করা -- সংজ্ঞানুযায়ী-ই কাজগুলি খারাপ। সুতরাং কোনো সাহাবী কেনো, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পাপীর ক্ষেত্রেও কাজগুলি করা সঙ্গত নয়। আমাদের নবীজির শিক্ষা গ্রহণ করলে অবশ্যই আমরা কাউকে গালি দেব না, হেয় প্রতিপন্ন করবো না, হিংসা করবো না।

হাদিসের প্রসঙ্গে বলছি : বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি -- আরও অনেক হাদিস গ্রন্থে অসংখ্য হাদিস আছে, যাতে এমনকি পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও আছে, আবার একটি হাদীসের বিপরীতে আরেক হাদিস দিয়ে যুক্তি দেওয়া যায়, এমনটিও আছে। সেক্ষেত্রে কী করণীয় ? তারপর আবার, "সহীহ" বলা হলেও, আসলেই সেগুলো ১০০ ভাগ সহীহ কিনা, সেই যুক্তি-প্রমাণই বা কোথায় ? এজন্যে হাদিস বিশারদ ও ইতিহাসবিশারদ হওয়া প্রয়োজন। আর যতক্ষণ তা না হচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত কী করবো ? এটাও সত্য যে সকল মানুষের জন্য হাদিস বিষয়ে পারদর্শী হওয়াকে আল্লাহ তায়ালা বাধ্যতামূলক করেননি। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষেরা কিভাবে সমস্যার সমাধান করবো ?

এক্ষেত্রে যেই ভুলটা আমাদের দেশেরসহ বিশ্বের অনেক মুসলমানকে ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত রেখেছে, তা হলো বিচারবুদ্ধির ব্যবহারকে দূরে ঠেলে দেওয়া। অথচ বিচারবুদ্ধি কোরআনের পর সবসময় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তা না করে কেউ কেউ অন্ধভাবে এক হাদীসের অনুসরণ করে, এবং তার বিপরীতে আরেক হাদিস উত্থাপন করলে সেটাকে যয়ীফ বা অন্য কিছু বলে রিজেক্ট করে দেয়। আবার অপর পক্ষও তার পছন্দমতো হাদিসের অনুসরণ করে এবং বিপরীতে আরেক হাদিস আনলে সেটাকে রিজেক্ট করে দেয়। অথচ কেউ-ই এই পরস্পরবিরোধী যুক্তির হাদিসগুলোর ক্ষেত্রে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে না। অন্ধ অনুসরণই এখানে মূল সমস্যা বলে আমি মনে করি। আমি বিচারবুদ্ধির (reasoning) আলোকে নিচের কথাগুলি বলার চেষ্টা করছি।

কোনো কোনো হাদিসে বলা হয়েছে কোরআন ও আহলে বাইতকে (হযরত ফাতেমা, হযরত আলী, ইমাম হাসান, ইমাম হোসেন) আঁকড়ে ধরতে, তাহলে কেউ বিপথগামী হবে না। (যেমন, তিরমিযি : ৩৭৮৬)। আবার একটি হাদীস অনুসারে, নবীজি (সা.) বলেছেন " হে আম্মার, যখন দেখবে আলী এক পথে চলছে আর বাকী সাহাবারা অন্য, তখন তুমি আলীর সঙ্গে যেও ও অন্যদের ত্যাগ করবে । কারন, সে তোমাকে পতনের পথে পরিচালিত করবে না এবং হে'দায়েতের পথ হতেও বের হতে দেবে না।"
বিপরীতে আরেকটি হাদীস দেখুন। এই হাদীস অনুসারে, নবীজি (সা.) বলেছেন যে, তাঁর মৃত্যুর পরে ৩০ বছর খুলাফায়ে রাশেদা (অর্থাৎ সত্যপন্থী শাসক) শাসন করবেন। এর মধ্যে প্রথম চার খলিফা অন্তর্ভুক্ত। অথচ দেখুন, প্রথম খলিফা হযরত আবূ বকর (রা.) এর শাসনকে নবী-কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.) মেনে নেননি, এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত হযরত আলী (রা.)-ও হযরত আবূ বকরকে মেনে নেননি।
এখন, প্রথমে উল্লেখ করা হাদিসটি সত্য হলে, আবূ বকরের বিপরীতে হযরত আলীকে সমর্থন করতে হবে। দ্বিতীয় হাদীস অনুসারে, আবূ বকরও সত্যপন্থী, হযরত আলীও সত্যপন্থী। কিন্তু দেখুন একজন আরেকজনের বিরোধিতা করছেন। তাহলে অন্ততঃ বিরোধিতার বিষয়টিতে তাদের উভয়ের মতামত সত্য হতে পারে না। একজন নিশ্চয়ই ভুল। তাহলে কিন্তু দ্বিতীয় হাদিসটি তার যোগ্যতা হারায়। অর্থাৎ, এমন অনেক কন্ট্রাডিকশান আছে। দেখা যাচ্ছে যে হযরত আলীর পক্ষের হাদিসগুলোকে শিয়ারা উল্লেখ করছে, সুন্নিরা করছে আবার "৩০ বছর সত্যপন্থী শাসক থাকবেন" এই হাদীসকে। অথচ দুইটা পাশাপাশি আনলে, সেইসাথে কিছুটা ইতিহাস এনে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করলে গরমিল ধরা পড়ে।

এখন, মহানবীর সাহাবীগণের মধ্যে যখন বিরোধীতা হয়, একজন আরেকজনের বিরোধীতা করেন, একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং যুদ্ধ করেন, এমন অবস্থায় কি আপনি দুইজনকেই সমর্থন করতে পারবেন ? সাহাবীগণের সমালোচনার ব্যাপারে আপনি যে হাদীস উল্লেখ করেছেন, তার বিপরীতে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন।

হযরত আলী (আ.) মুয়াবিয়াকে সিরিয়ার গভর্নর পদ থেকে পদচ্যুত করেন। মুয়াবিয়া সিরিয়া থেকে হযরত আলীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং সিফফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয় এই দুই দলের মাঝে, যাতে উভয় পক্ষের বহু লোক মারা যান। আমি সেটার ডিটেইলস এ যাচ্ছি না। কিন্তু দেখুন : উভয়েই আল্লাহর নবীর সাহাবী ছিলেন। আবার উভয়েই পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। আপনি কি উভয় যুদ্ধের মৃতদেরই শহীদ বলবেন ? আপনি কি উভয় পক্ষকেই সমর্থন করবেন ? উভয় পক্ষই সঠিক কাজ করেছে, সত্যের পথে আছে, একথা বলবেন ?
নিশ্চিতভাবেই তা বলা যাবে না। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য :
১. শুধুমাত্র হযরত আলী (আ.) ভুল পথে ছিলেন
২. শুধুমাত্র মুয়াবিয়া ভুল পথে ছিলেন
৩. উভয়েই ভুল পথে ছিলেন
কিন্তু উভয়ে সত্যের পথে হতে পারেন না। সত্য কখনোই পরস্পবিরোধী হতে পারে না। সত্য কখনোই এক ব্যতীত দুটি হয় না। এক্ষেত্রে কী করবেন ?

কেবলমাত্র আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ-ই ভুলের উর্ধ্বে নয়। হযরত আলীর বিরুদ্ধে হযরত আয়েশার যুদ্ধে আপনি কি উভয়কেই সমর্থন করবেন ? উভয়েই কি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ? উভয়েই কি সঠিক পথে ছিলেন ?

এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যার জন্য বিচারবুদ্ধির দ্বারস্থ হতেই হবে। তা না করে আপনি এক হাদিস আনলেন তো আরেকজন তার বিপরীত হাদিস আনলো, এভাবে করলে কখনোই আমরা সমাধানে পৌঁছাবো না।
মুয়াবিয়া কর্তৃক ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। এক্ষেত্রে ইমাম হাসান ও মুয়াবিয়া -- উভয়কেই সঠিক বলতে পারবেন না।
মুয়াবিয়ার সাথে ইমাম হাসানের সন্ধিচুক্তি হয়, যা পরে মুয়াবিয়া ভঙ্গ করেন।
এক্ষেত্রে উভয়কে সঠিক বলতে পারবেন না। আর সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করাটিই একটি অপরাধ। এক্ষেত্রে কাকে সঠিক বলবেন ?
মুয়াবিয়া সন্ধি অনুযায়ী ইমাম হোসেনকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সন্ধি ভঙ্গ করে তার ছেলে ইয়াজিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, যে কিনা পরবর্তীতে ইমাম হুসেইনকে কারবালার প্রান্তরে হত্যা করে।
এক্ষেত্রে সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করা, ইয়াজিদের মত পাপীকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা, ইত্যাদি কাজকে সঠিক বললে ইমাম হাসান ও হোসেনকে ভুল বলতে হবে।

আমার মূল কথা হচ্ছে, সত্য একাধিক হতে পারে না। এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর গ্রহণে অন্ধভাবে পরস্পরবিরোধী হাদিস রেফারেন্সিং না করে বিচারবুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করা অতি জরুরি। আর যদি তা না করা হয়, তবে বিরোধ নিরসন কখনোই সম্ভব নয়।

যদি মুয়াবিয়ার কর্মকাণ্ডকে ভুল হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তার বিপরীতে হযরত আলী (আ.), ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনকে সঠিক বলে গণ্য করেন, তাহলে :
১. মুয়াবিয়ার উপর "আল্লাহ রাজি" (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) একথা বলা যায় কিনা ? ইয়াজিদের উপর সালাম পাঠানো যায় কিনা ?
২. তার নামের সাথে "রা." লেখা বা বলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি তার কর্মকাণ্ডগুলো সঠিক ছিলো কিনা, এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ? কারণ আল্লাহ তায়ালা কাউকে জাহান্নামী করলে কোটি মুসলমানের দোয়ার সাধ্য নেই যে তাকে জান্নাতে ফিরায়। কোন আলোচনা বেশি গুরত্বপূৃণ ? রাদিয়াল্লাহু আনহু বলা যাবে কি যাবে না, নাকি তার কর্মকাণ্ডগুলো সঠিক ছিলো কি ছিলো না ?
৩. মুয়াবিয়ার কর্মকাণ্ডকে সঠিক বললে অবশ্যই হযরত আলী (আ.), ইমাম হাসান, ইমাম হোসেন এর কিছু কিছু কর্মকাণ্ডকে ভুল বলতে হবে। সেক্ষেত্রে আবার উপরের ১ ও ২ নং প্রশ্ন আসে যে : যে এত বড় বড় ভুল কাজ করেছে, তার উপর আল্লাহ রাজি কিনা ? যে এত বড় বড় ভুল কাজ করে, আল্লাহ তার উপর কী করে রাজি থাকতে পারেন ? আর তার নামের সাথে রাদিয়াল্লাহ আনহু বলা গুরুত্বপূর্ণ, নাকি তার ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার শিক্ষা গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ ?

হযরত আলীর বিরুদ্ধে নবীজির স্ত্রী হযরত আয়েশা এর যুদ্ধে আপনি উভয়কে সঠিক বলতে পারবেন না।
আমি গোড়াতেই বলে নিয়েছি যে গালি দেয়া, হেয় প্রতিপন্ন করা, হিংসা করা -- এই কাজগুলি এমনকি পৃথিবীর জঘন্য অপরাধীর ক্ষেত্রে করাও মুসলমানদের জন্য সঙ্গত নয়, আর সেখানে হযরত আয়েশা তো নবীজির স্ত্রী হিসেবে উম্মতের মায়ের মর্যাদাপ্রাপ্ত। কিন্তু যদি ঐ যুদ্ধের ক্ষেত্রে হযরত আয়েশা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে সেই ভুলের কারণ বিশ্লেষণ করে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে দোষ কোথায় ?
শিয়ারা যদি সেই ভুল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে গালি দেয়, তবে সেটা পাপ।
আর সুন্নিরা যদি অন্ধ বিশ্বাস থেকে অন্ধ ভক্তি করে থাকে, তবে সেটা হঠকারিতা এবং নির্বুদ্ধিতা। এক প্রকার পাপও বটে।

যে সমস্যা আমি চারিদিকে দেখছি, তা হলো reasoning এর আশ্রয় না নেয়া। কিংবা বড়জোর ততটুকু পর্যন্ত রিজনিং করা, যতটুকু পর্যন্ত রিজনিং করলে নিজের (অন্ধ) বিশ্বাসকে সাপোর্ট দেয়া যায়। এক্ষেত্রে প্রেজুডিস থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বৃহত্তর ঐক্য সুদূর পরাহত।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

টাকার ইতিহাস, মানি মেকানিজম ও ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের মহা জুলুম

(লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।) **জালিমের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম**

জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাস হলো মহররম মাস।
জালিমের মুখোশ উন্মোচনের মাস মহররম।
জুলুমের কূটকৌশল উন্মোচনের মাস মহররম।
আধুনিক সেকুলার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় লেজিসলেশান (সংসদ), আর্মড ফোর্সেস (আর্মি) ও জুডিশিয়ারি (আদালত) হলো এক মহা জুলুমের ছদ্মবেশী তিন যন্ত্র, যারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে জুলুম টিকিয়ে রাখার জন্য।
তারচেয়েও বড় জালিম হলো big corporations: বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, যারা তাবৎ দুনিয়াকে দাস বানিয়ে রেখেছে।
আর এই দাসত্বের শৃঙ্খলে তারা আমাদেরকে আবদ্ধ করেছে ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের মাধ্যমে:
টাকা আমাদের শ্রমকে ধারণ করে, অথচ সেই টাকার মূল্য আপ-ডাউন করায় অন্যরা -- ব্যাংক ব্যবসায়ীরা!
টাকা আমাদের শ্রমকে সঞ্চয় করার মাধ্যম,
অথচ সেই টাকা আমরা প্রিন্ট করি না, প্রিন্ট করে (ব্যাংকের আড়ালে) কিছু ব্যবসায়ী! সেই টাকার মান কমে যাওয়া (বা বেড়ে যাওয়া) আমরা নির্ধারণ করি না -- নির্ধারণ করে ব্যাঙ্ক (ব্যবসায়ীরা)!
ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রতিবাদী চেতনাকে ধারণ করব, শোকাহত হব কারবালার স্মরণে, অভিশাপ দেব জালি…

ধর্মব্যবসা: মুসলমানদের হাতে ইসলাম ধ্বংসের অতীত-বর্তমান (১)

ভূমিকা যদিও পলিটিকাল-রিলিজিয়াস ইস্যুতে নিশ্ছিদ্র আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করে আলোচনা করার অভ্যাস আমার, কিন্তু এখানে বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরে আর্গুমেন্ট করার প্রথমতঃ ইচ্ছা নেই, দ্বিতীয়তঃ সময় ও সুযোগ নেই। আমি যা সত্য বলে জানি, তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। যারা আমার উপর আস্থা রাখেন তাদের জন্য এই লেখাটি সোর্স অব ইনফরমেশান, উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষদের জন্য সত্য অনুসন্ধানের নতুন কিছু টপিক, আর প্রেজুডিসড ধর্মান্ধ রোগগ্রস্ত অন্তরের জন্য রোগ বৃদ্ধির উছিলা। শেষ পর্যন্ত আর্গুমেন্ট ও ডায়লগের দুয়ার উন্মুক্ত রাখার পক্ষপাতী আমি, কিন্তু সেই আর্গুমেন্ট অবশ্যই সত্য উন্মোচনের নিয়তে হওয়া উচিত, নিজের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস ও ধ্যান ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করবার উদ্দেশ্যে নয়। মক্কা-মদীনা: মুহাম্মদ (সা.) থেকে আলে-সৌদ (৬২৯-১৯২৪) এদেশের অধিকাংশ মানুষ মক্কা-মদীনার ইতিহাস কেবল এতটুকু জানেন যে, মুহাম্মদ (সা.) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন। কিন্তু প্রায় চৌদ্দশ’ বছর আগে মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র থেকে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরবের ইতিহাস কম মানুষই জানেন। পবিত্র ম…

পিস টিভি, জাকির নায়েক ও এজিদ প্রসঙ্গ

সম্প্রতি গুলশান হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। আমি তখন দিল্লীতে ছিলাম। দেশে ফিরে শুনি পিস টিভি ব্যান করা হয়েছে বাংলাদেশে, এবং তার আগে ইন্ডিয়াতে।

আমার বাসায় টিভি নেই, এবং আমি জাকির নায়েকের লেকচার শুনিও না। কিংবা পিস টিভিতে যারা লেকচার দেন, বাংলা কিংবা ইংলিশ -- কোনোটাই শুনি না; প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া আমার ইসলামের বুঝ জাকির নায়েকসহ পিস টিভি ও তার বক্তাদেরকে ইন জেনারেল আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। Peace TV বন্ধ হওয়ায় এদেশে বিকৃত ইসলাম প্রসারের গতি কমলো -- এটাই আমার মনে হয়েছে।

একইসাথে আমি এটাও মনে করি যে, যেই অভিযোগ পিস টিভিকে ব্যান করা হয়েছে, তা নিছক অজুহাত। জাকির নায়েক কখনো জঙ্গীবাদকে উস্কে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। কিংবা পিস টিভির লেকচার শুনে শুনে ISIS জঙ্গীরা সন্ত্রাসী হয়েছে -- এটা নিতান্তই হাস্যকর কথা। ISIS এর ধর্মতাত্ত্বিক বেইজ সম্পর্কে মোটেও ধারণা নেই, এমন লোকের পক্ষেই কেবল ISIS এর জন্য জাকির নায়েককে দোষ দেয়া সম্ভব। একইসাথে আমি এ বিষয়েও সচেতন যে, পিস টিভি বন্ধ করা হয়েছে আমাদের সরকারের রেগুলার “ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ” হিসেবে, এই জন…